ভূমিকম্পের আতঙ্কে সারাদেশে ৬ জনের মৃত্যু

ভূমিকম্পসোমবার (৪ ডিসেম্বর) ভোরে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান কেঁপে ওঠে। হঠাৎ কম্পনে শেষ রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এতে দৌড়ঝাঁপ করতে গিয়ে এবং উঁচু ভবন থেকে লাফ দিয়ে পড়ে শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে ঢাকা, লালমনিরহাট, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জামালপুরে  হার্টঅ্যাটাকে অন্তত সাতজন মারা গেছেন বলেও জানা গেছে।  
পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে রাজধানীর পূর্ব জুরাইনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আতিকুর  রহমান (২৯) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত আতিকুর রহমানের পরিবারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ভূমিকম্পের সময় আতিক আতঙ্কিত হয়ে বাসার সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বাড়ি কুষ্ঠিয়ার মিরপুর উপজেলায়।
এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নারী ও শিশুসহ প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে ও ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে তারা আহত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আহত হয়েছেন ২৯ জন।
রাজশাহীতে ভোররাতে ভূমিকম্প আঘাত হানার পর আতঙ্কে প্রাণ হারান খলিলুর রহমান (৭০) নামের একজন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলের প্রধান বাবুর্চি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এদিকে, লালমনিরহাটে ভূমিকম্পের আতঙ্কে এক মুদি ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় ঘুম থেকে উঠে দ্রুত ঘর থেকে বের হতে গিয়ে নূর ইসলাম কদু (৫০) মারা যান। তার বাড়ি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ঘোনাবাড়ী এলাকার কদুর বাজারে। পাটগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শাহ জামাল তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নূর ইসলাম ভূমিকম্পের সময় ঘুম থেকে উঠে আতঙ্কে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এরপর তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

সোমবারের এ ভূমিকম্পের আতঙ্কে সিরাজগঞ্জের বেলকুচির উপজেলার বওড়া গ্রামে আবুল কাশেম (৪০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। বেলকুচি পৌরসভার নব-নির্বাচিত মেয়র বেগম আশানুর বিশ্বাস নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ভোর রাতে ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করতে গেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঘটনাস্থলেই কাশেম মারা যান।

বগুড়ার নন্দীগ্রামের দূর্জয়পুর গ্রামে আতঙ্কিত হয়ে হার্টঅ্যাটাকে আহমেদ আলী (৫০) নামে এক কৃষক মারা গেছেন। নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বর আকতারুজ্জামান মানিক জানান, ভোরে ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পর দুর্জয়পুর গ্রামের কৃষক আহমেদ আলী তার ছেলেমেয়েদের ডাকাডাকি করেন। তারা ঘর থেকে বের হয়ে খোলা মাঠে চলে যান। পরে ছেলেরা ঘরে গিয়ে দেখেন তিনি (আহমেদ) মারা গেছেন। মৃত আহমেদ আলীর ছেলে ওসমান আলী তার বাবার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার দুরমুঠ ফুলতালা গ্রামে সোমবার ভোরে ভূমিকম্প আতঙ্কে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে সোনা মিয়া (৩৮) নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে।  নিহত সোনা মিয়া ইসলামপুর উপজেলার গাঁওকুড়া গ্রামের মৃত বশির শেখের ছেলে। তিনি ইসলামপুর বাজারে একটি কাপড়ের দোকানের খলিফা ছিলেন। 

নিহতের বড় ভাই মোহাম্মদ মৃনাল শেখ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তার ছোট ভাই সোনা মিয়া ইসলামপুর উপজেলার ফুলতলা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। গত রবিবার রাতেও ইসলামপুর বাজারে খলিফার কাজ শেষ করে সে শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। ভোরে ভূমিকম্পের সময় ঘুম থেকে উঠে ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সোনা মিয়া মাথা ঘুড়ে মাটিতে লুটিয়ে পরেন। এসময় দ্রুত ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।

উল্লেখ্য সোমবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ভারতের মণিপুর রাজ্যের রাজধানী ইম্ফল থেকে ৩৩ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ছিল বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। ভূমিকম্পের আঘাতে ভারতে এখন পর্যন্ত ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা থেকে ভূমিকম্প উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল ৩৫১ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর-পূর্বে। তবে সিলেট থেকে কেন্দ্রস্থ কাছে হওয়ায় সেখানে ভূমিকম্প বেশি অনুভূত হয়েছে। আতঙ্কে তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সিলেটে অন্তত ৩৩ জন আহত হয়েছেন বলে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডা. দেবাশীষ সিনহা বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন।

/এআর/জেবি/এফএস/ এএইচ/