রূপগঞ্জের আগুন: কিশোরগঞ্জের একই পরিবারের ৬ জনসহ নিখোঁজ ১৪   

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কিশোরগঞ্জের একই পরিবারের ছয় জনসহ ১৪ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। শনিবার (১০) তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ করতে দেখা যায়।

জানা গেছে, ওই কারখানার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার শিমূল কালিয়া দক্ষিণ কালিয়াকান্দা গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী শ্রমিক নাজমুল; কটিয়াদী উপজেলার গৌরীপুর গ্রামের তাসলিমা, রাবিয়া, মাহমুদাসহ সাত জন এবং করিমগঞ্জ উপজেলার কদমতলী ও মথুরাপাড়া গ্রামের জাহানারা, সাহেলা, রেহেনা, হাকিমা, আহাদসহ মোট ১৪ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে করিমগঞ্জ উপজেলার কদমতলী গ্রামের এক পরিবারের ছয় জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের পরিবারের লোকজন জানিয়েছে, ডিএনএ টেস্টের জন্য তাদের স্বজনদের ঢাকায় তলব করেছে প্রশাসন। 

অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ নাজমুলের মা বুকভাটা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বারবার। তিনি জানান, তার ছেলে এবার স্থানীয় একটি হাইস্কুল থেকে এসএসসি দেওয়ার কথা। কিন্তু বাবা দিনমজুর থাকায় পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে ওই কোম্পানিতে কাজ করতে চলে যায় নাজমুল।

ছয় সদস্য নিখোঁজ থাকা পরিবারটির বয়োবৃদ্ধ সদস্য মো. সলিম উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলের বউ, নাতি, মেয়ের ঘরের নাতিসহ পরিবারের ছয় জনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা যে কোথায় আছে, জীবিত না মৃত কিছুই জানতে পারছি না।’

ইউনিয়ন পরিষদ সাবেক চেয়ারম্যান জালাল উদ্দীন জানান, এ এলাকায় যারা নিখোঁজ রয়েছেন তারা করোনার কারণে স্থানীয়ভাবে কাজ না পাওয়ায় রূপগঞ্জ পাড়ি জমিয়েছিল। তারা বেশির ভাগই খুব অভাবে দিনাতিপাত করতো। সামনে ঈদ, তাই পরিবারের সদস্যদের খুশি ও আনন্দ দিতে তারা সবাই সেখানে কাজ করতে গেছে। কিন্তু এমন ঘটনায় এলাকায় এখন শোকের মাতম বইছে।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম জানান, এ ঘটনা খুবই কষ্টকর ও দুঃখজনক। মৃত এবং নিখোঁজদের ব্যাপারে যাবতীয় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের নিহতদের তালিকা প্রস্তুত করার পর সেই মোতাবেক ব্যাপারে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও মানবাধিকার কর্মীরা।

প্রসঙ্গত, রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুস কারখানায় বৃহস্পতিবার (০৮ জুলাই) বিকাল সাড়ে ৫টায় আগুনের সূত্রপাত হয়। কারখানার ছয় তলা ভবনটিতে তখন প্রায় চারশ’র বেশি কর্মী কাজ করছিলেন। কারখানায় প্লাস্টিক, কাগজসহ মোড়কিকরণের প্রচুর সরঞ্জাম থাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সব ফ্লোরে।

প্রচুর পরিমাণ দাহ্য পদার্থ থাকায় কয়েকটি ফ্লোরের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিটের ২০ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। শুক্রবার (০৯ জুলাই) দুপুরে কারখানার ভেতর থেকে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে, আগুনে পুড়ে তিন জনের মৃত্যু হয়। সবমিলে এ পর্যন্ত ৫২ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। কারখানায় আগুনের ঘটনায় প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে।