চাঁদপুরের ষাটনল থেকে হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার নদী এলাকায় রয়েছে ৩৮ হাজার জেলে। ঘুরে দেখা গেছে, রূপালী ইলিশ ও অন্যান্য মাছ শিকার করে চলে তাদের জীবিকা। দরিদ্র্য এসব জেলেদের অনেকেই আর্থিক অনটনের কারণে নিজেদের শিশু সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালাতে পারেন না। ফলে শিশুরা প্রাথমিক শেষ করার আগেই বাবা, ভাই কিংবা অন্য কারও সঙ্গে জাল নিয়ে নদীতে নামছে।
সদর উপজেলার বহরিয়া এলাকার শিশু জেলে হাসান প্রাথমিকের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই নৌকা আর জাল নিয়ে নেমে পড়েছে মেঘনায়। হাসান বলে, আমরা গরীব, ঠিকমতো প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়। তাই পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে নদীতে মাছ ধরতে যাই।
নদীতে মাছ শিকারের জন্য নৌকা মেরামতের কাজে ব্যস্ত শিশু রাকিব। সে বলে, স্কুলে যাই না, মা-বাবাকে খাওয়ানো লাগে। তারা অসুস্থ্য, তাই তাদের খরচ চালাতে হয়। পড়ালেখা বাদ দিয়ে নদীতে জাল বাই।
মাছের দেখা না মিললে দু বেলা খাবার যোগাড় করাই যেখানে কঠিন হয়ে পড়ে জেলেদের, এ অবস্থায় সন্তানদের পড়ালেখার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই নদীপাড়ের এ মানুষগুলোর।
চাঁদপুরের হরিণা এলাকার অভিভাবক জাকির হোসেন বলেন, সন্তানদের কীভাবে পড়াবো? স্কুলে পাঠাতে হলে প্রাইভেট পড়ানো লাগে, বেতন, খাতা-কলম এসব নানা খরচ চালানো আমাদের মতো সাধারণ জেলেদের জন্য খুবই কঠিন। তাই কাজে সাহায্য করার জন্য সন্তানকে নদীতে নিয়ে যাই।
আরেক অভিভাবক আব্দুল হক বলেন, আমরা চরের, নদীপাড়ের মানুষ। অভাব-অনটন আমাদের নিত্যসঙ্গী। তাই ছোটকালেই ছেলেকে নদীতে দিয়ে দেই মাছ ধরার জন্য।
শিক্ষক ও জেলে পরিবারের শিশুদের শিক্ষাবঞ্চিত হওয়া ঠেকাতে সংশিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা।
এ বিষয়ে চাঁদপুর পৌরসভার কাউন্সিলর ডিএম শাহজাহান বলেন, জনপ্রতিনিধি, সরকার এবং সমাজের সচেতন নাগরিকরা যদি জেলে পরিবারের শিশুদের লেখাপাড়ার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে আমি বিশ্বাস করি তাদের মধ্য থেকেও অনেক শিশু সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। পাশপাশি জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করতে হবে।
শতভাগ শিশু ভর্তির দাবি করলেও প্রতি বছর ঝরে পড়া জেলে পরিবারের শিশু শিক্ষার্থীদের সংখ্যা জানা নেই জেলা শিক্ষা অফিসের। তবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কথা জানালেন চাঁদপুর সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমা বেগম।
বাংলা ট্রিবিউনকে নাজমা বেগম বলেন, জেলে পরিবারের সন্তানদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তবে আমাদের শিক্ষকরা হোম ভিজিট, মা সমাবেশ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। তারপরও জেলেরা সহযোগিতার জন্য সন্তানদের নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরা বাচ্চাদের স্কুলে আনতে জেলেদের বাড়িতে গেলেও তারা বলে- আমার ছেলে পড়বে না, আপনারা চলে যান। তারপরও শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন- বাচ্চাদের নিয়মিত স্কুলে আনতে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চাঁদপুরে ৩৮ হাজার ১৫৬ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। এরা সবাই ১৮ বছরের ওপরে। এর মধ্যে ২০ হাজর ৪০৪ জন জেলে কার্ডধারী।
আমিনুর আরও বলেন, কত সংখ্যক জেলে পরিবার রয়েছে তার তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে ধারণা করা যায় চাঁদপুরে প্রায় ২৫-৩০ হাজার জেলে পরিবার রয়েছে। তবে কত সংখ্যক শিশু নদীতে মাছ শিকারের কাজ করে তার হিসাব নেই।
চাঁদপুর জেলা আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মানিক দেওয়ান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পড়ালেখা করেছে এমন জেলের সংখ্যা ৫ শতাংশেরও কম। এ কারণেই তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব। এদের সচেতন করতে হলে শিক্ষার আলো দরকার।
তিনি আরও বলেন, কোনও জেলে বাবা যখন নৌকা চালাতে মানুষ না পান তখন নিজের ৮-১০ বছরের বাচ্চাদের নিয়ে যান নদীতে। সরকার যদি এমন আইন করতো যে ১৫-১৮ বছরের নিচে কোনও শিশুকে নদীতে নেওয়া যাবে না, তাহলে তারা আর নদীতে আসতে পারতো না। সেক্ষেত্রে বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়া সহজ হতো।
তিনি বলেন, চাঁদপুর জেলায় আনুমানিক ২২-২৫ হাজার জেলে পরিবার আছে। এদের প্রত্যেকের পরিবারেই ২-৫ জন শিশু রয়েছে।
/এআর/এফএস/