নারায়ণগঞ্জ শহরের বাবুরাইলে ফ্ল্যাট বাসায় দুই শিশুসহ একই পরিবারের ৫ জন খুনের ঘটনায় বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাসলিমা ও তার স্বামী শফিকুল ইসলাম বেশ কিছু টাকা ঋণী ছিলেন। ঢাকার কয়েকজনের কাছ থেকে ওই টাকা ঋণ নেওয়ার পর থেকে পরিশোধের জন্য চাপ ছিল। সেই চাপের কারণে ময়মনসিংহের একটি জমি বিক্রিও করা হয়। কিন্তু অব্যাহত হুমকির কারণে ভীত ছিল পরিবারের লোকজন।
শনিবার রাতে ওই হত্যাকাণ্ডের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান নিহত তাসলিমা ও মোরশেদুল ইসলামের মা মোর্শেদা বেগম ও তাসলিমার খালাতো বোন নয়নতারা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মোর্শেদা বেগম জানান, তার মেয়ে তাসলিমার সঙ্গে ১৩ বছর আগে শফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা ঢাকার ধানমণ্ডিতে বসবাস করতেন। ওই সময়ে বিভিন্ন কারণে বাহাদুর, বাদশা, বাদলসহ প্রায় ৮/১০ জনের কাছ থেকে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা সুদে ঋণ নেয় শফিকুল। এদের বাড়ি ধানমণ্ডি এলাকাতেই। ঢাকায় যে বাড়িতে শফিকুল ভাড়া থাকতেন ওই বাড়ির একজনের কাছ থেকেও টাকা সুদে নেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লিখিতরা শফিকুলকে টাকার জন্য চাপ দিতো, কখনও হুমকিও দিতো। টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তিন মাস আগে শফিকুল পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জ চলে আসে। পরে প্রতি সপ্তাহে বিশেষ করে বৃহস্পতিবার রাতে নারায়ণগঞ্জের বাসায় আসতো। আবার শনিবার সকালে চলে যেতো। শফিকুল ঢাকায় একটি কোম্পানির গাড়ি চালক। নারায়ণগঞ্জ আসার পরেও ফোন করে টাকার জন্য চাপ দিতো পাওনাদাররা।
মোর্শেদা বেগম বলেন, কত টাকা ঋণ তার পরিমাণ জানতাম না। তবে গত কয়েকদিন আগে আমরা ময়মনসিংহের একটি জায়গা বিক্রি করেছিলাম। আরও টাকা চেয়েছিল তাসলিমা। এছাড়া মোরশেদুল ইসলামও ফোন করে এক লাখ টাকা চেয়েছিল। টাকাটা জরুরি ছিল বলেও জানায় মোরশেদুল।
মোর্শেদার ধারণা, ঋণের কারণে যারা হুমকি দিতেন তারা হয়তো এ খুনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
তিনি আরও জানান, শুক্রবার রাত সাড়ে ১২ টার দিকে তার ছেলে মোরশেদুলের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়। এরপর শনিবার সারাদিন মেয়ে তাসলিমা ও ছেলে মোরশেদুলের নম্বর বন্ধ ছিল। শনিবার রাত ৭ টার দিকে নিহত তাসলিমার দেবর শরীফ মিয়া কিশোরগঞ্জের পাহাটি এলাকা থেকে এসে দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে মোরশেদুলের খালাতো ভাই দেলোয়ার হোসেনসহ অন্যদের ডেকে আনেন। তারা বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়াদের উপস্থিতিতে দরজার তালা ভেঙে ভেতরে ৫টি লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
তাসলিমার খালাতো বোন নয়ন তারা জানান, সুদের টাকা নিয়ে ঢাকার একটি পক্ষের সঙ্গে বিরোধ ছিল। সে বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
পুলিশ সুপার মহিদ উদ্দিন বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে পারিবারিক বিরোধের কারণেই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। কারণ বাইরে থেকে ঘরের দরজার তালা মারা ছিল এবং হত্যাকাণ্ডের সময় প্রতিবেশি বা অন্য কেউ কোনও শব্দ পায়নি। এই অবস্থায় ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকারীরা পূর্বপরিচিত। নিহতদের মাথায় আঘাতের চিহ্ন ও ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যার করার আলামত পাওয়া গেছে।
তাসলিমার ননদ শহরের খানপুরের বাসিন্দা হাজেরা বেগম জানান, তাসলিমার স্বামী শফিক মিয়া গাড়ি চালক। তিনি ঢাকায় একটি কোম্পানির প্রাইভেটকার চালান। সপ্তাহে একদিন তিনি বাড়িতে আসেন। ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাবুরাইল এলাকার ইসমাইল হোসেনের ছয়তলা বাড়ির নিচতলায় কয়েক মাস আগে ভাড়া নেন।
বাড়ির মালিক আমেরিকা প্রবাসী ইসমাইলের চাচাতো ভাই হাজি মোহাম্মদ হোসেন জানান, গত নভেম্বর মাসে শফিক ও তার স্ত্রী তাসলিমা ২ কক্ষবিশিষ্ট ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়। মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে রাত ৮টার দিকে নিহতের স্বজনরা ঘরটির তালা ভেঙে ৫ জনের লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়।
পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া গৃহিণী রহিমা বেগম জানান, উনাদের কাছে এরকম খারাপ কিছু দেখিনি। আমি ১৫ দিন হলো এই বাড়িতে ভাড়া এসেছি। তবে খুনের পর বাইরে থেকে কে বা কারা তালা দিয়েছে তাও জানি না। রাতে কিভাবে তারা বাড়িতে প্রবেশ করলো তাও বলা যাচ্ছে না।
শনিবার রাতে ২ নং বাবুরাইল এলাকার ইসমাইল হোসেনের ১৩১/১১ নং বাড়িতে ৫ জন খুন হন। তারা হলেন তাসলিমা (৩৫), তার ছেলে শান্ত (১০), মেয়ে সুমাইয়া (৫), তাসলিমার ছোটভাই মোরশেদুল (২২) ও তার জা লামিয়া বেগম (২৫)।
/এমএসএম/
/আপ-এএ/