নিহতদের পরিবারের এই সদস্য আরও বললেন, ‘নূর হোসেন ফিরে আসার পর তাকে রিমান্ডে নেয়নি তদন্তকারী সংস্থা। ফিটফাট পোশাকে হাসিমুখে আদালতে আসছেন তিনি, খোশ মেজাজে কথা বলছেন আইনজীবীসহ তার অনুসারীদের সঙ্গে। চার মামলায় জামিন এবং একটি হত্যা মামলায় খালাসও পেয়ে গেছেন তিনি। আমাদের মতো চুনোপুঁটির কথায় আর কী এসে যায়। বিচারের জন্যে স্রষ্টার দিকে তাকিয়ে আছি।’
সাত খুন-পরবর্তী সময়ে বিচারের দাবিতে নিহতের পরিবারগুলো জোরালো অবস্থান নিলেও যতই দিন যাচ্ছে ক্রমশ ততই তারা নিরুৎসাহিত ও ভীত হয়ে পড়ছেন। বাদী, সাক্ষী ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা যায়।
সোমবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সাত খুনের ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়ের করা দুটি মামলার চার্জ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সাত খুনের বিচার প্রক্রিয়া। একটি মামলার বাদী নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। অপর মামলার বাদী নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণ।
প্রথম দিকে মামলা দুটির দুই বাদীর সাক্ষ্য নেওয়া হবে। পরবর্তী তারিখে নেওয়া হবে অন্যদের সাক্ষ্য। বাদী দু’জনের মধ্যে বিজয় কুমার পাল মামলার চার্জশিট গঠনের সময় থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত হত্যা নিয়ে তেমন কোনও মন্তব্য করেননি। নিজের অবস্থানে দৃঢ় সেলিনা ইসলাম বিউটি। সাক্ষীদের অবস্থান নিয়ে সংশয়ী দু’জনই। কারণ, অভিযোগ উঠেছে, অব্যাহত হুমকির ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে সাক্ষীদের।
সাত খুনের ঘটনার পর বিউটির দেওয়া মামলার চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি হাজী ইয়াসিন মিয়াসহ পাঁচজনকে। অব্যাহতির পর তারা এলাকাতে ফিরে এসে হুমকি দিয়ে চলেছেন বলে বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন সেলিনা ইসলাম বিউটি।
দুটি মামলায় মোট ১২৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। মামলার দুটির চার্জশিট, আলামত ও সাক্ষীর সংখ্যা একই হওয়ায় একই দিনে কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
সোমবার দুটি মামলার চার্জ গঠনের পর হুমকির মাত্রা বেড়ে গেছে বলে জানান সেলিনা ইসলাম বিউটি। তিনি বলেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে ঠিকই, কিন্তু আমাদের আশঙ্কা, সাক্ষীরা হয়ত ঠিকমত সাক্ষ্য দিতে পারবেন না। সাক্ষীদের ওপর এখনও অনেক কিছু নির্ভর করছে। নূর হোসেন দেশে আসার পর থেকেই সাক্ষী ও নিহত স্বজনদের কাছে হুমকি আসছে। অনেকেই এখনও আর সাত খুন নিয়ে কথা চলতে চান না।
তিনি আরও বলেন, আদালতের ভেতরে ঘাতকদের আইনজীবীরা হট্টগোল করেছেন। আমরা ধারণা করছি, এই মামলার বিচার যাতে সঠিক না হতে পারে সেজন্য সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো হতে পারে। এই মামলার সকল সাক্ষীকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই।
এ বিষয়ে কথা হয় বাদী পক্ষের আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, চার্জশিট ত্রুটিপূর্ণ। এ অবস্থায় সাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে যদি অনুপস্থিত রাখা যায়, তা আসামিদের পক্ষে যাবে।
নূর হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১১ মামলার মধ্যে সোমবার একসঙ্গে চার মামলায় জামিন পেয়েছেন তিনি। নূর হোসেনের পক্ষে আটঘাট বেঁধে নেমেছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা, বিশেষ করে যারা আইন পেশায় জড়িত। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির (যেখানে ১৭ পদের মধ্যে সভাপতি ও সেক্রেটারিসহ ১৩ পদধারীই আওয়ামী লীগ সমর্থক) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যে কারও পক্ষে আইনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অধিকার আইনজীবীর আছে। সুতরাং নূর হোসেনের পক্ষে কেউ আইনী লড়াই চালালে বাধা দেওয়া হবে না।
আইনজীবী সমিতির এই মতের প্রতিফলন ঘটে সোমবার। সাত খুনের দুটি মামলার চার্জ গঠনের সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাত খুনের ঘটনায় নূর হোসেন জড়িত না থাকার সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। মামলা দুটির প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন ২৩ জন। রবিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ওই ২৩ আসামির উপস্থিতিতে চার্জ গঠন করা হয়।
সোমবার চার্জ গঠনের বিষয়টি যখন আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা যায় নূর হোসেনকে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এসময় হাসিমুখে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন তিনি। প্রার্থনা করেন ন্যায়বিচারের।
সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত ও র্যাব-১১এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদও নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমি কাউকে চিনি না।’
মামলায় আসামিপক্ষের শুনানিতে অংশ নেন মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা,সাবেক পিপি সুলতানুজ্জামান, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এমএ রশিদ ভূঁইয়া, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফউজ্জামানসহ অর্ধশত আইনজীবী।
প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন নূর হোসেনের প্রতি আগেও যেমন অনুকূল ছিল এখনও তাই আছে। আমরা অভিযোগ পত্রের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে নারাজি দিয়েছিলাম। তার প্রেক্ষিতে অভিযোগ পত্রে ১২০ ধারা (খ) সংযোজন করা যেতে পারে বলে জানিয়েছিলেন মহামান্য উচ্চ আদালত। ১২০ ধারা হলো পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র। পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের বিষয় আনতে হলে অবশ্যই নূর হোসেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ আদালত থেকে বলা হয়েছে পুলিশ চাইলে অধিক তদন্ত করতে পারে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার আদেশের কপি হাতে পাওয়ার আগেই মিডিয়ার মাধ্যমে তা জেনে গিয়ে বলেন, অভিযোগ পত্রের সুষ্ঠু তদন্ত হয়েছে। আর কোনও তদন্তের প্রয়োজন নেই।
সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, নূর হোসেনকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কারণ, তাকে জিজ্ঞাসাবাদে রাঘব বোয়ালদের নাম বের হয়ে আসবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম অপহৃত হন। ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও ১ মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ওই ঘটনায় দুটি মামলা হয়। বাদী বিজয় পাল অজ্ঞাত ও বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি নূর হোসেনসহ ছয় জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। দুটি মামলার তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ পত্র দেয় পুলিশ। বিউটির মামলায় অভিযুক্ত পাঁচ জনকে পরে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
/এইচকে/এপিএইচ/