রাজশাহীতে নির্যাতনের বর্ণনা দিলো দুই শিশু

শিশু জাহিদ (বামে) ও ইমন‘আমরা কয়েকজন খৈলানে (মাঠে) খেলছিলাম। ওরা আমাকে এখান থেকে ধইরে নিয়ে গেছে, ধইরে নিয়ে বুলেছে তুই মোবাইল চুরি করছিস। তুই কোন্ঠি থুইছিস (কোথায় রাখছিস) বের করে দে, তোকে ১ হাজার টাকা দিবো, আমার ওটা (মোবাইল) দে। আমি বুলছি আমি নেইনি, আমি জানি না তাও ধইরে নিয়ে আমাকে মারছে। হাতে পেরেক পুঁতেছে, হাতুড় ও রড নিয়ে বুকের ওপর পা তুলে দিয়ে বলছে এখনও বের করে দে। পায়ে রড দিয়ে মারছে, বাঁশ দিয়ে আমাকে মারছে, হকিস্টিক দিয়ে মেরে হকস্টিক ভেঙে তিন থান (টুকরা) করে ফেলছে।’
রাজশাহীর পবায় মুঠোফোন চুরির অভিযোগে শুক্রবার বিকেলে নির্যাতনের শিকার দুই শিশুর একজন ইমন কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলে। সোমবার দুপুরে পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বর্বরোচিত ওই নির্যাতনের বর্ণনা দেয় ইমন।  শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর অনেকটাই বিপর্যস্ত এই শিশুটির চোখে-মুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ রয়েছে। আতঙ্কে থেকে থেকে চমকে উঠছে অপর শিশু জাহিদও।
একই ঘটনায় নির্যাতনের শিকার জাহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়,‘ওরা (নির্যাতনকারীরা) প্রথমে ইমনকে ধরে ঘরে আটকে নির্যাতন করে। নির্যাতনের ভয়ে ইমন তার নাম বলে দেয়। তখন নির্যাতনকারীরা আমাকে ধরে আনে এবং রাত ১০টা পর্যন্ত আমাদের দুই জনকেই নির্যাতন করা হয়। পরে আমাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর আরও মার খাওয়ার আশঙ্কায় ইমন পালিয়ে যায়। তাই তাকে দু’দিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।’
জাহিদ জানায়, লাঠি দিয়ে অত্যধিক পেটানোতে এখনও তার সারা শরীর ব্যথা করছে। বুকে ব্যথার কারণে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে তার। আর বাম গালে আঘাত পাওয়ায় কিছু খেতে খেতে গেলেও প্রচণ্ড ব্যথা লাগছে।
নির্যাতনের শিকার দুই শিশুকে চিকিৎসা দিচ্ছেন পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার মুকাররাবী। তিনি বলেন, ইমন ও জাহিদের শরীরে মারাত্মক কোনও জখম নাই। তবে বেশ কিছু জায়গায় আঘাতের চিহ্ন আছে। শারীরিক আঘাতের চেয়ে তারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। সেটাই এখন তাদের জন্য বড় ঝুঁকি। এই বয়সে তাদের জন্য এটি বড় ধরনের মানসিক চাপ যা তাদের পরবর্তী জীবনে প্রভাব পড়তে পারে।
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় এক প্রতিবেশীর কাছে ছেলেকে নির্যাতনের খবর পান জাহিদের মা শিরিন খাতুন। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যান সেখানে। তিনি বলেন, ‘ওরা আমার ছেলেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেরেছে। এতোবার বলেছি আমাকে আমার ছেলের কাছে একবার যেতে দেন। কিন্তু ওরা আমাকে ঢুকতে দেয়নি। নির্যাতনকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকার কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি।’

জাহিদের বাবা ইমরান হোসেন বলেন,‘আমার ছেলেকে এতো কষ্ট দিয়েছে। ছেলে আমার ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। পায়ের তালুতে মারায় তালুতে কালশিটে দাগ পড়েছে। আমি এর নায্যবিচার চাই।’

জাহিদের বাবা ও মা

জাহিদের বাবার মতো ইমনের নানী হালিমা খাতুনও দোষীদের বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন,‘দুনিয়াতে ওর কেউ নাই, ওর দাদিরাও ওকে দেখতে পারে না। আমরা নাতিকে মারার বিচার চাই।’

কে বেশি নির্যাতন করেছে জানতে চাইলে ইমন অভিযুক্ত সেনা সদস্য নাসিরের নাম উল্লেখ করে। সে বলে,‘ ওই আর্মি আমাকে নিচে ফেলে দিছে, আমার গোপণাঙ্গ পা দিয়ে মাড়িয়েছে ‘ এসময় রেজাউল নামে আরেকজনের নামও উল্লেখ করে সে। ইমন জানায়, ‘উনি (রেজাউল) আমার হাত ব্যান্দি (বেঁধে) মেরেছেন।’

এদিকে দুই শিশু নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে এলাকাবাসী। সোমবার দুপুর ১২টা থেকে একটা পর্যন্ত রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজটের।

পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরিফুল ইসলাম জানান, বেলা ১২টার দিকে উপজেলার দুয়ারী মোড়ে চৌবাড়িয়া গ্রামের শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় জাহিদ ও ইমনের নির্যাতনকারীদের দ্রুত  গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। প্রায় একঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ রাখার পর বিক্ষোভকারীরা পুলিশের অনুরোধে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ইমন তাকে মারধরের ঘটনায় রেজাউল নামে আরও এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে। এ ব্যাপারে ওসির দৃষ্টি আকর্ষণ করায় তিনি আরও জানান,  যদি এরকম আরও কারও নাম পাওয়া যায় তবে নির্যাতিত শিশুর ১৫৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করে তাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ছুটিতে থাকা অভিযুক্ত সেনা সদস্য নাসির ও পুলিশ সদস্য সাগরের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মাঠেই আছি। অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার বিকেলে মোবাইল চুরির অভিযোগে বিকেল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত জাহিদ হাসান (১৫) ও ইমন (১৩) নামের দুই কিশোরকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে রশি দিয়ে বেঁধে বেধড়ক পেটান কয়েক ব্যক্তি। শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আসামিরা জাহিদকে ধরে মারধর করেন এবং মোবাইলে ভিডিও ধারণ করা হয়। শনিবার তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে ফাঁস হয়ে গেলে বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়।

আহত দুই শিশুর মধ্যে শনিবার সকালে জাহিদ হাসানকে পবা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। আর ভয় ও আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় ইমন। রবিবার রাতে তাকে উদ্ধারের পর একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এ ঘটনায় শনিবার রাতে জাহিদ হাসানের বাবা ইমরান আলী পবা থানায় একজন সেনা ও আরেক পুলিশ সদস্যসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিদের মধ্যে আজিজুলকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

অন্য আসামিরা হলেন, চৌবাড়িয়া গ্রামের সমশের মুহরির ছেলে পলাশ, মুন্নার ছেলে তুহিন, সান্দি মল ও তার ছেলে অনিক, বেরাজের ছেলে রাজ্জাক, বারির ছেলে আজিজুল, আজিজুলের ছেলে উজ্জ্বল, ফজর আলীর ছেলে মাছিম, ফরিদের ছেলে কমল, ফজলুল বারি ও তার ছেলে রাকিব। 

/টিএন/

আপ: এইচকে