কোনও ঘোষণা ছাড়াই দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে মারাত্মক সংকটে পড়েছেন বহু কিডনি রোগী।
রোগীরা জানান, প্রায় চার মাস ধরেই হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবায় বিঘ্ন ঘটছে। এখানে আগে মাত্র ৪০০ টাকা দিয়েই ডায়ালাইসিসের সুবিধা পেতেন রোগীরা। কিন্তু ডায়ালাইজার, ব্লাড লাইন, স্যালাইনসহ যাবতীয় ওষুধপত্র সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ রেনাল কেয়ার-এসি ও রেনাল কেয়ার-বি ফ্লুইড (পানি) রোগীদের সরবরাহ করা হতো। চলতি মাসের ২ তারিখ থেকে সেটি সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটতে থাকে। এতদিন বাইরে থেকে রোগীর স্বজনরা এসব কিনে এনে ডায়ালাইসিস করাতেন। এতে একজনের প্রতিবার ডায়ালাইসিস করাতে প্রায় ২৯০০ টাকা খরচ হতো। তারপরও জীবন বাঁচাতে এই অর্থ খরচ করতেন তারা। কিন্তু হঠাৎ করেই পূর্ব ঘোষণা ছাড়া হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে নিরুপায় হয়ে মঙ্গলবার রোগীরা পরিচালকের কক্ষের সামনে বসে পড়েন।
হাসপাতালে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থেকে আসা রোগী হরেকৃষ্ণ রায় বলেন, ‘আমি ১২ বছর ধরে ডায়ালাইসিস করি। কিন্তু এখন এখানে ডায়ালাইসিস বন্ধ হয়ে গেছে। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার স্ত্রী ক্যানসারের রোগী। কয়েকদিনের মধ্যে তাকে একটা ইনজেকশন দিতে হবে ঢাকায়। দাম চার লাখ টাকা। আমার চিন্তাও সেও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। এখন আমার ডায়ালাইসিস হচ্ছে না। কী করবো বুঝতে পারছি না। আমাদের দিকে কেউই তাকায় না।’
জেলার ফুলবাড়ী থেকে আসা মরিয়ম বলেন, ‘পানি সাপ্লাই নেই। এতে আমরা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। ডাইলাইজারও দেওয়া হচ্ছে না, ব্লাড লাইনও দেওয়া হচ্ছে না। এখন পানি দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে আমরা কিডনি রোগীরা বাঁচবো কীভাবে?’
ঠাকুরগাঁও থেকে আসা রোগী হাসান আলী বলেন, ‘চার বছর ধরে আমি এখানে চিকিৎসা নিচ্ছি। অনেকদিন ধরেই হাসপাতালে ব্লাড লাইন, ডায়ালাইজার, স্যালাইন, হেপারিন দেওয়া হচ্ছে না। যে পানিটুকু আগে সাপ্লাই দেওয়া হতো, এক মাস ধরে তাও দেওয়া হচ্ছে না। আমরা জীবন বাঁচাতে বাইরে থেকে এসব কিনে চিকিৎসা নিচ্ছি। এতে আর্থিক অপচয় হচ্ছে, আমাদের কষ্ট হচ্ছে। আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। বর্তমানে কোনও কিছুরই সাপ্লাই নেই।’
বীরগঞ্জ থেকে আসা রোগী মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এখানে কিডনি ডায়ালাইসিস হচ্ছে না। আমার শ্বাসকষ্ট, খেতে পারি না, ঘুমাতে পারি না। অনেক সমস্যা হচ্ছে।’
ফুলবাড়ী উপজেলার রাঙ্গামাটি এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রুবিয়া বেগম বলেন, ‘পানি পাচ্ছি না, ডায়ালাইজার পাচ্ছি না। কিছুই পাচ্ছি না। আমাদের খুব অসুবিধা হচ্ছে, বাঁচবো কীভাবে? এখন সবকিছুই বন্ধ করে দিয়েছে। সংসারের সবকিছুই তো শেষ হয়ে যাচ্ছে ডায়ালাইসিস করতে করতে। তাহলে কেমন করে চলবো?’
রুবিয়া বেগমের ভাই তানিম বলেন, ‘তিন হাজার টাকা দিয়ে আমি ব্লাড লাইন, স্যালাইনসহ বিভিন্ন উপকরণ কিনে আনলাম। আগে হাসপাতাল থেকে দেওয়া হতো। এখান থেকেই দেওয়ার কথা। কিন্তু এখন আর দিচ্ছে না। এখন পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। একবার ডায়ালাইসিস করলে চার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আমরা খুবই টেনশনে আছি।’
সেবা না পেয়ে মঙ্গলবার ডায়ালাইসিসের রোগীরা হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষের সামনে লিফলেট হাতে নিয়ে বসে পড়েন। প্রায় একঘণ্টা পর রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন পরিচালক ডা. এটিএম নুরুজ্জামান। প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করার আশ্বাস দেওয়া হলে পুনরায় ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে ফিরে যান রোগীরা।
এদিকে, পরিচালকের কক্ষের সামনে রোগীদের বসে পড়ার খবর পাওয়ার পর সাংবাদিকরা হাসপাতালে যান। সেখানে রোগীদের সঙ্গে কথা বলার পর পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে গেটে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা পরিচালক কথা বলবেন না বলে জানান। পরে পরিচালক কথা না বলেই হাসপাতাল থেকে চলে যান।
পরে মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমার জরুরি মিটিং ছিল, এজন্য তখন কথা বলা সম্ভব হয়নি। রোগীরা এসেছিলেন আমার কাছে, কথা বলেছেন। আমাদের ফ্লুইড শেষের দিকে। বাজারেও পাওয়া যাচ্ছে না, আমরাও কিনতে পারছি না। আমরা কষ্ট করে কিছু ম্যানেজ করেছি। বাজারে পর্যাপ্ত নেই। অনেক কষ্টে ম্যানেজ করা হয়েছে। এসব চার থেকে পাঁচ দিন যাবে। আমরা আবারও সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি।’