সাত খুন মামলা: সাক্ষ্য গ্রহণের মুলতবি আবেদন নাকচ, সাক্ষ্য নেওয়ার পরবর্তী তারিখ ধার্য

7-murder 2নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার চার্জশিটের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে দায়ের করা পিটিশনের প্রেক্ষিতে নিম্ন আদালতে সাক্ষ্য মুলতবি করতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যে আবেদন করেছিলেন তা নাকচ করে দিয়েছেন আদালত। সেইসঙ্গে বিউটির সাক্ষ্য গৃহীত হওয়ার পর অবশিষ্টদের সাক্ষ্য নেওয়ার পরবর্তী তারিখ হিসেবে ১০ মার্চ ধার্য করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টায় থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত নারাণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের শুনানী অনুষ্ঠিত হয়।
আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, সাত খুনের দুটি মামলায় চার্জশিটভুক্তদের সংখ্যা ৩৫। তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন ২৩ জন। বৃহস্পতিবার ওই ২৩ জনকে আদালতে উপস্থিত করা হয়। এর মধ্যে নূর হোসেন, এম এম রানা ও তারেক সাঈদের পক্ষে আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আবেদনের কথা বলে সাক্ষী মুলতবির আবেদন করেন।
পিপি আরো জানান, উচ্চ আদালতের কোনও আদেশ না থাকায় ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তির কারণে ওই মুলতবির আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়। তবে তিন আসামীর পক্ষে আরও সময় চেয়ে আবেদন করায় আগামী ১০ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ও উচ্চ আদালতের পিটিশনের নিষ্পত্তি না হওয়ায় এদিন আদালত সাক্ষ্য মুলতবি না করে নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তিন আসামীর পক্ষে পরে সময় প্রার্থনা করায় তিনজন ছাড়া উপস্থিত অপর ২০ আসামি ও পলাতক ১২ আসামির পক্ষের আইনজীবীরা বিউটিকে জেরা করেন।

এদিন আদালতে সাংবাদিকদের প্রবেশে কোন ধরনের বাধা দেওয়া হয়নি। বরং ভেতরে সাংবাদিকদের বসার জন্য আলাদা আসন রাখা হয়।

সাক্ষ্য প্রদান শেষে সেলিনা ইসলাম বিউটি সাংবাদিকদের বলেন, আমি আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছি। এজাহারে আমি যা যা লিখেছি তার বর্ণনা দিয়েছি। আমি সাত খুনের খুনিদের ফাঁসি চাই। আমার স্বামী নজরুল ইসলাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ছিলেন। আমার স্বামী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আর নূর হোসেন জামায়াত বিএনপি করতো।

বিউটি আরও বলেন, নূর হোসেন ও তার লোকজন চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি মাদকবিক্রিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতো। আমার স্বামী প্রতিবাদ করতেন। তাদের আদর্শিক বিরোধে ছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই নূর হোসেনের পরিকল্পনায় আমার স্বামীসহ সাতজনকে হত্যা করা হয়।

আদালতে উপস্থিত আসামী পক্ষে সাবেক অ্যাটর্নী জেনারেল আশরাফুজ্জামান, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সেক্রেটারী খোকন সাহা, সাবেক পিপি সুলতানউজ্জামান, এম এ রশিদ ভূঁইয়া, আনিসুর রহমান মোল্লাসহ অর্ধশত আইনজীবী বাদীকে জেরা করেন।

এর আগে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি একই আদালতে অন্য আরেকটি মামলার বাদী নিহত অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পালের সাক্ষ্যগ্রহণের দিনও নূর হোসেন, র‌্যাব কর্মকর্তা এমএম রানা এবং তারেক সাঈদের পক্ষে তাদের আইনজীবী বাদীকে জেরার জন্য আদালতের কাছে সময় প্রার্থনা করেন। এরপরই আদালত ৭ মার্চ বিজয় পালের দ্বিতীয় স্বাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য করেন।

প্রসঙ্গত ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহীম অপহৃত হন। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও ১ মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

তদন্ত শেষে প্রায় এক বছর পর  ২০১৪ সালের ৮ এপ্রিল নূর হোসেন, র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। কিন্তু অভিযোগপত্র থেকে পাঁচ আসামিকে বাদ দেওয়ায় এবং প্রধান আসামি নূর হোসেনের জবানবন্দি ছাড়া অভিযোগপত্র আদালত আমলে নেওয়ায় ‘নারাজি’ আবেদন করেন সেলিনা ইসলাম বিউটি।

আবেদনটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও জজ আদালতে খারিজ হয়ে গেলে বিউটি উচ্চ আদালতে যান। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, পুলিশ চাইলে মামলাটির ‘অধিকতর তদন্ত’ করতে পারে এবং ‘হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার’ ধারা যুক্ত করে নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাত খুনের দুটি মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এ মামলায় নূর হোসেন ও র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। আর চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে এখনও ১২ জন পলাতক রয়েছেন।

গত ১২ নভেম্বর নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর ১৩ নভেম্বর সাত খুনের দুটি মামলাসহ ১১টি মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে। ১১টি মামলার মধ্যে সাত খুনের দুটি মামলা, চাঁদাবাজীর তিনটি এবং অস্ত্র আইনসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

/এইচকে/