রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে মনোয়ারুল ইসলাম নামে নাশকতা মামলার আসামি এক বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়েছে। রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক জানান, বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে অসুস্থ হয়ে তার মৃত্যু হয়। তবে স্বজনদের অভিযোগ, গ্রেফতারের পর থানায় একদিন আটকে রেখে নির্যাতন করায় তার মৃত্যু হয়েছে।
মনোয়ারুল ইসলাম রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মিটারী ইউনিয়নের পশ্চিম চড়ইছলী গ্রামের ফজলে রহমানের ছেলে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক।
কারাগারের জেল সুপার জানান, চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি আসামি মনোয়ারুল ইসলামকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়। তখন থেকে তিনি কারাগারেই আটক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে নাশকতাসহ বিভিন্ন অপরাধে তিনটি মামলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে অসুস্থ হয়ে পড়ায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি মারা যান।
তিনি আরও জানান, কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে ২১ জানুয়ারি থেকে ২৩ জানুয়ারি তিন দিন কারাগারে অবস্থিত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সুস্থ হওয়ার পর তাকে আবারও কারাগারে নেওয়া হয়।
তবে, কী কারণে মনোয়ারুল অসুস্থ হয়েছিলেন সে সম্পর্কে জেল সুপার কিছুই জানাতে পারেননি।
মনোয়ারুলের বাবা ফজলে রহমান, ছোট ভাই হারুনসহ স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, ১৩ জানুয়ারি তাকে দিনের বেলায় বাসা থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। এরপর সেইদিনই আদালতে চালান না দিয়ে পরের দিন রাত পর্যন্ত থানায় আটকে রেখে মারাত্মক নির্যাতন করা হয়। তার শরীরে পায়ে, পিঠে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। এজন্য পুলিশি নির্যাতনেই মনোয়ারুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন বলে মনে করছেন স্বজনরা। তারা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডেড হাউজে ছুটে আসা মৃত বিএনপি নেতা মনোয়ারুলের ছোট ভাই হারুন জানান, তার ভাইয়ের মরদেহের পা, পিঠে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন তিনি দেখেছেন। মনোয়ারুলকে গ্রেফতার করে থানায় আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাবা ফজলে রহমান বলেন, ‘আমার ছেলে সুস্থ। তার কোনও রোগবালাই ছিল না। সুস্থ ছেলেকে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। সে বিএনপি করতো বলে আমরা শুনেছি। তাকে থানায় আটকে রেখে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
একই কথা বলেন চাচা মমতাজ মিয়া মিয়া। তিনি বলেন, ‘ভালো ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো। আজ লাশ হয়ে ফিরলো। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’ তিনি ঘটনার তদন্ত করে বিচার দাবি করেন।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিএনপি নেতা মনোয়ারুল ইসলামকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর কারাগারের পুলিশ পাহারায় তার লাশ হাসপাতালের ডেড হাউজে রাখা হয়। দুপুর সোয়া ২টার দিকে রংপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ান প্লের উপস্থিতিতে লাশের সুরতহাল করা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, লাশের সুরতহাল করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ ফরেনসিক বিভাগে নেওয়া হয়েছে।
গঙ্গাচড়া থানার ওসি মাসুমুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘কারাগারে আটক একজন বিএনপি নেতা নাকি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন বলে শুনেছি। তাকে বিএনপি করার জন্য গ্রেফতার করা হয়নি। রংপুরের একজন নারী আইনজীবীকে তিস্তা সড়ক সেতুর কাছে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গত ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরের দিন সকালেই তাকে আদালতে চালান দেওয়া হয়েছে। তাকে নির্যাতন করার মতো কোনও ঘটনাই ঘটেনি।’ তিনি আরও জানান, আসামি মনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন , ছিনতাই, মাদক কারবারসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।
এদিকে, গঙ্গাচড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাবু দাবি করেন, মৃত মনোয়ারুল ইসলাম বিএনপির একজন ডেডিকেটেড নেতা। বিএনপির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখ সারির সৈনিক ছিলেন তিনি। তাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। অন্যায়ভাবে তাকে থানায় আটকে রাখা হয়েছিল বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।’