মীরসরাই ট্র্যাজেডি

সড়কে নিহত ৪২ শিক্ষার্থীকে স্মরণ করে কাঁদলেন স্বজনরা

বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ফটকে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’-এ একটি ছবির ওপর হাত বুলিয়ে ধুলা মুছে দিচ্ছেন এবং বারবার চোখ মুছছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। কাছে গিয়ে জানা গেলো, তিনি ২০১১ সালের ১১ জুলাই মীরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহত আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আল মোবারক জুয়েলের বাবা হুমায়ুন কবির। কার ছবি মুছছেন, জিজ্ঞেস করতেই গুমরে কেঁদে ওঠেন তিনি। হুমায়ুন কবিরের মতো বৃহস্পতিবার সকালে আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ছুটে আসেন নিহত শিক্ষার্থীদের বাবাসহ অনেক স্বজন।

২০১১ সালের ১১ জুলাই মীরসরাই স্টেডিয়াম থেকে বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা শেষে ফেরার সময় শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি পিকআপ মীসরাইয়ের বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় পাশের একটি ডোবায় উল্টে ৪২ জন স্কুলছাত্রসহ ৪৫ জন নিহত হন। নিহতদের স্মরণে প্রতি বছর ১১ জুলাই পালন করা হয় ‘মীরসরাই ট্র্যাজেডি দিবস’। দিনটিতে স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ এ পুষ্পস্তবক অর্পণ, স্মৃতিচারণ সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। সন্তান হারানোর সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে এখনও চোখের জল ফেলেন নিহতদের স্বজনরা। এখনও যাওয়া-আসার পথে দুর্ঘটনাস্থলে থমকে দাঁড়ায় পথিক।

নিহত আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তারেক হোসেনের বাবা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘মীরসরাই ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও আমার তারেককে একদিনের জন্যও ভুলতে পারিনি। দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন কর্মকর্তারা নিহতদের পরিবারের পাশে থাকবেন বলে ঘোষণা দিলেও কেউ আমাদের খোঁজ রাখেন না। বছর ঘুরলে স্মরণ সভায় দাওয়াত দেন শুধু। আমি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। আমার ছোট ছেলে এইচএসসি পাস করে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরীর কাজ করে। তার সরকারি চাকরির জন্য অনেকের কাছে গিয়েও কোনও সহায়তা পাইনি। সরকার যদি মীরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায় তাহলে আমাদের দুঃখ কিছুটা হলেও লাঘব হতো।’

আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিহত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশরাফ উদ্দিনের বাবা নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘স্মৃতিস্তম্ভ “আবেগ”-এর প্রথম ছবি আমার আশরাফের। সে নতুন জামাকাপড় পরতে খুব পছন্দ করতো। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সে সবার ছোট ছিল। বেঁচে থাকলে আজ তার ২৩ বছর বয়স হতো। আমি প্রতিদিন আবুতোরাব বাজারে আসলে ছেলেকে দেখে যাই। স্মৃতিফলকে বাঁধানো ছবিগুলোর ধুলা মুছে দিই। আশরাফের শোকে তার মা এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।’

আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির নিহত শিক্ষার্থী আল মোবারক জুয়েলের বাবা হুমায়ুন কবির কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘মীরসরাই ট্র্যাজেডির পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিরা নিহতদের পরিবারের পাশে থাকবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও কেউ আমাদের খবর রাখেননি। আমার ছেলের মতো আর কেউ যাতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা না যান সেজন্য সরকারের কঠোর আইন করা উচিত।’

ফুলের শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণ ও দোয়ার মাধ্যমে মীরসরাই ট্র্যাজেডির ১৩তম বছর পালন করা হয়েছে। নিহতদের স্মরণে দুর্ঘটনাস্থলে নিহতদের স্মরণে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’ এবং আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থিত ‘আবেগ’-এ মীরসরাইয়ের সংসদ সদস্য মাহবুব উর রহমান রুহেলের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ ছাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান উম্মে কুলসুম কলি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক একেএম জাহাঙ্গীর ভূঁইয়ার নেতৃত্বে উপজেলা আওয়ামী লীগ, উপজেলা ছাত্রলীগ, আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।

দুপুরে আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের আয়োজনে নিহতদের স্মরণে স্মৃতিচারণ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন। এ সময় আরও বক্তব্য দেন– উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান উম্মে কুলসুম কলি, প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার, মঘাদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি তোফায়েল উল্লাহ চৌধুরী নাজমুল, উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মাসুদ করিম রানা, মায়ানী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি নুরের ছাপা নয়ন।

স্মরণ সভায় মীরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহতদের পরিবারের সদস্য, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।