কুমিল্লার নতুন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগ পেয়েছেন আইনজীবী কাইমুল হক রিংকু। মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) নিয়োগের পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তোলা তার ছবি ভাইরাল হয়েছে। এ নিয়ে কুমিল্লার আদালতপাড়ায় শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিতে নানান মন্তব্যও করছেন নেটিজেনরা।
কাইমুল হক রিংকু কুমিল্লার সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর ভাই ও কুমিল্লার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী।
ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডান পাশে সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু। বাঁ পাশে প্রথমে সাক্কুপত্নী আফরোজা জেসমিন টিকলি, তার পাশেই সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ানো আইনজীবী কাইমুল হক রিংকু। তাদের দুই পাশে আরও তিন ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সবার গলায় এসএসএফের কার্ড ঝোলানো।
জানা গেছে, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর অনুবিভাগের উপ-সলিসিটর (জিপি-পিপি) সানা মো. মাহরুফ হোসাইন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তারেক আব্দুল্লাহ এবং এপিপি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মাহবুবুল হক খন্দকার। এ ছাড়াও ১২৮ জনকে অতিরিক্ত পিপি ও এপিপি, অতিরিক্ত জিপি ও এপিপি নিয়োগ দেওয়া হয়।
তিনি আরও লেখেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন নিবেদিতপ্রাণ আইনজীবী আলী আক্কাস। কুমিল্লা বিএনপির সব নেতাকর্মীর মামলায় যিনি সব সময় আদালতে সহযোগিতা করে আসছেন। যাকে আদালতে সব মামলায় পাশে পাওয়া যেতো। যিনি নিজের কথা চিন্তা না করে দলের নেতা কর্মীদের জন্য পরিশ্রম করে যেতেন। এই বয়সে এসে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন জেলখানায় বন্দি ছিলেন। মামলা-হামলার শিকার হয়েও, দল তাকে মূল্যায়ন করতে পারেনি। আজ আদালতে যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তাদের আমরা কোনও মামলায় কখনও পাশে পাইনি। তাদের নামে মামলা তো দূরে থাক, কখনও তাদের কোনও আন্দোলন-সংগ্রামে পাওয়া যায়নি। ত্যাগীদের মূল্যায়ন চাই দলে।’
একই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে মেহেদী হাসান নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘বিএনপি বহির্শত্রুর চেয়ে ঘরোয়া শত্রুর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি।’
জাহাঙ্গীর আলম নামে একজন লিখেছেন, ‘অনেক নেতাই কুমিল্লায় অবহেলিত। আগাছা, পরগাছা, মাদকসম্রাট, নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িতরাই বর্ষীয়ান নেতা কুমিল্লায়।’
শরীফুর জামান সবুজ নামের একজন লেখেন, ‘এসব কারণেই ত্যাগীরা হারিয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কুমিল্লার সহসভাপতি ফারুক আহমেদ বলেন, ‘যারা ত্যাগ করে তারা আসলে কিছুই পায় না। যুগে যুগে হাইব্রিডরাই লাভবান হয়। কাইমুল হক রিংকু সাহেব গত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার ভাই ও দল থেকে আজীবন বহিষ্কৃত মনিরুল হক সাক্কুর নির্বাচনি প্রধান এজেন্ট ছিলেন। এমন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের জেলা পিপি হিসেবে নিয়োগ করলে কে মেনে নেবে বলেন? ফেসবুকে যেটা হচ্ছে এটা স্বাভাবিক। কারণ ছাত্র-জনতার এই বিপ্লব হয়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের জন্য। আর ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী ছিলেন তিনি আর তার ভাই। এত শত শত শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে কীভাবে তাকে পিপি বানানো হলো তা আমরা জানি না। তা ছাড়া তার ভাই মেয়র থাকাকালেও স্থানীয় আওয়ামী এমপি বাহারের সঙ্গে “মামা-ভাগনের ৬০/৪০ ভাগাভাগি”র হিসেব রাখতেন তিনি। আর ত্যাগীদের বাদ দিয়ে তাকে বানানো হলো পিপি।’
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির কুমিল্লা মহানগরীর ৮ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি রেজাউল করিম মিঠু বলেন, ‘এখন তো বিএনপি ক্ষমতায় নেই, স্বাভাবিকভাবেই ত্যাগীদের মূল্যায়ন হওয়ার কথা নয়। তাই তারা পেয়েছেন। যদি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতো তাহলে আর ফেসবুকে পোস্ট করতো না। এখানে ত্যাগীদের মূল্যায়ন হয়নি, এটা সবাই জানে, কিন্তু কী করার। তিনি খালেদা জিয়ার একটি মামলার আইনজীবী শুনলাম। এটি দিয়েই সব করছে। আসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও মানুষ সমালোচনা করছে।’
ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক জেলা পিপি এএইচএম তাইফুর আলম বলেন, ‘তারা হলেন “পলিটিক্যাল বেনিফিসিয়ারিজ অব কুমিল্লা”। তাদের ভাগ্য কত ভালো চিন্তা করতে পারেন? আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার ভাই স্থানীয় এমপির সঙ্গে মেয়র হয়েছেন। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের কথা কুমিল্লার সবাই জানে? কিন্তু দেখুন, তারাই আবার ঘুরে-ফিরে সুবিধা নিচ্ছে। তবে আমার মনে হয় মন্ত্রণালয় ছবির বিষয়টি জানেন না। জানলে নিশ্চয়ই এটি কোনোভাবেই হতো না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে পিপি নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয় যে প্রক্রিয়ায় এগোতো এবার তার কোনও কিছুই দেখিনি। আমরা ৩-৪ জনের একটা তালিকা পাঠাতাম। এরপর মন্ত্রণালয় বিবেচনা করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে একটা প্রজ্ঞাপন করাতেন। কিন্তু এবার তার কিছুই দেখিনি। তদবিরে হয়ে গেছে।’
এ বিষয়ে জানতে কাইমুল হক রিংকুর ফোনে একাধিক একাধিকবার কল ও পরে মেসেজ পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।