যশোরের কেশবপুর উপজেলার ব্রহ্মকাটির নৃত্যশিল্পী আফরোজ জাহান অ্যানির মায়ের ওপর হামলাকারী বিল্লাল হোসেনকে পুলিশ এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি। ৫ মার্চ থেকে পরিবারের সব সদস্যসহ তিনি বাড়িছাড়া। পুলিশ তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে।
ব্রহ্মকাটি এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবেই পরিচিত। তাদের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে জমি কিনে এখানে বাড়ি করেন অ্যানির বাবা যাত্রাশিল্পী আনোয়ার হোসেন। আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী সাহিদা বেগমও যাত্রাশিল্পী ছিলেন। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা অ্যানি নিজেও একজন ভালো নৃত্যশিল্পী। কেশবপুর ছাড়াও ঢাকা বা অন্য জেলায় তিনি নাচের মাধ্যমেই তার ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন।
ঘটনার শুরু
২০১৫ সালের প্রথমদিকে তিনি কেশবপুর পৌর এলাকায় মহিলা কলেজের পাশে ‘ড্রিম স্টার ড্যান্স অ্যাকাডেমি’ নামে নাচের একটি স্কুল খোলেন। এখানে অনেকেই নাচ শিখতেন। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি বিল্লাল। সে প্রায়ই অ্যানিকে পথে যাওয়া-আসার সময় উত্ত্যক্ত করতো। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি আর অনৈতিক প্রস্তাব ছিল অ্যানির প্রতি। অ্যানি তার এই অশ্লীল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তার প্রতি রাগের সূত্রপাত। সে কারণে রাতে অ্যানিকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে আসা সহকর্মীদের বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি এবং মারপিট করার হুমকি দিতো সে ও তার কয়েক বন্ধু।
একপর্যায়ে বাবা আনোয়ার হোসেনের অনুরোধে একাডেমিটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন এক সন্তানের জননী অ্যানি।
২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি কেশবপুরের সাগরদাঁড়ীতে মধুমেলার অনুষ্ঠানে একদল শিল্পী আসেন অ্যানিদের বাসায়। ঢাকা, দিনাজপুরসহ দেশের কয়েকটি স্থানের এসব শিল্পী তাদের বাড়িতেই ওঠেন।
ওইদিন সন্ধ্যার কিছু আগে অ্যানির মা মোবাইল ফোনে আনোয়ার হোসেনকে জানান দ্রুত বাসায় আসতে। অ্যানির বাবার বাজারে একটি ওষুধের দোকান রয়েছে।
আনোয়ার বাসায় এসে জানতে পারেন, বিল্লাল ও তার সহযোগীরা শিল্পীদের নিয়ে যাওয়ার জন্যে আসা মাইক্রোবাসচালককে মারধর করতে উদ্যত হয়েছে। কেন তারা শিল্পী বিশেষ করে অ্যানিকে সাগরদাঁড়ীতে নিয়ে যাচ্ছে- সেকারণে ড্রাইভারের ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজে এসেও বিল্লাল ও তার বন্ধুদের মুখে খিস্তি-খেউড় শুনেছেন। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালের পাশাপাশি খেঁজুরের পাতা (বাকল) দিয়ে তাকে মারতে উদ্যত হন বিল্লাল।
পরে লোকজন এসে তাদের নিবৃত্ত করলে তিনি চলে যান।
কিন্তু রাত ৮টার দিকে ফের বিল্লাল আবারও আসে অ্যানিদের বাসায়। অ্যানির মাকে কথা আছে বলে গেট খুলতে অনুরোধ করে। তারা ভেবেছিলেন, বিকেলের ঘটনায় বিল্লাল অনুতপ্ত হয়ে হয়তো মাফ চাইতে এসেছে। কিন্তু, দু’এক কথার পরেই বিল্লাল তার পেছনে গুঁজে রাখা একটি হাতুড়ি বের করে অতর্কিতে সাহিদা বেগমের মাথায় বাড়ি মারেন। এতে সাহিদা বেগম মারাত্মক আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন। বাড়ির লোকজনের চিৎকারে বিল্লাল ও তার সঙ্গে থাকা আরও দু’জন দৌড়ে পালিয়ে যায়। এরপর তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়।
মামলা দায়ের
এ ঘটনাটি পরদিন কেশবপুর থানার ওসিকে মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়। দু’দিন পরে ২৪ জানুয়ারি থানায় লিখিত এজাহার দেন আনোয়ার হোসেন।
বিল্লালের পরিবার থেকে কেউই আসেনি বিষয়টি সুরাহার জন্যে। বরং রাত-বিরাতে আনোয়ার হোসেনকে পথে প্রায়ই কটু কথা বলতে থাকে বিল্লাল ও তার বন্ধুরা। একদিন রাতে তাকে ধাওয়াও করে দুর্বৃত্তরা। এ অবস্থা চলে প্রায় ২০-২৫ দিন।
সালিশ এবং ফের মারধর
একদিন স্থানীয় কাউন্সিলর মফিজুর রহমান মোবাইলফোনে অ্যানির বাবাকে সালিশে বসার প্রস্তাব দেন। ১ মার্চ সকালে বিল্লালের চাচা জোহর আলী মাস্টারের বাসায় বসেন তারা। এই সালিশে বিল্লালের বাবা আব্দুস সামাদ এবং স্থানীয় কয়েকজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সালিশকারীরা একপর্যায়ে ৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণে বিষয়টি মীমাংসা করতে অনুরোধ করেন। একইসঙ্গে বিল্লালের বাবাকে মাফ চাইতে বলেন।
ওইসময় বিল্লাল সেখানে ছিলেন না। কিন্তু বৈঠকের এই সিদ্ধান্ত মানতে রাজি হননি অ্যানির পরিবার। আর ক্ষতিপূরণের টাকা দিতেও ইতস্তত করছিলেন বিল্লালের বাবা। এই অবস্থায় অমীমাংসিতভাবেই সালিশ শেষ হয়ে যায়।
পরদিন সকালে আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে চা খাওয়ার কথা বলেন স্থানীয় কাউন্সিলর। কিন্তু সে রাতেই বিল্লাল তার মাকে সঙ্গে নিয়ে আরও ৫-৬সহ হানা দেয় অ্যানিদের বাড়ি।
সাহিদা বেগম জানান, বিল্লাল ও তার মাসহ কয়েকজন এসে প্রথমে তার মুখ চেপে ধরে। এরপর কয়েকজন মিলে তাকে কিল, ঘুষি, লাথি মারতে থাকে। একজন বলে এবার শেষ করে দেবো। মারার সময় কেউ বলেছিল, ১০দিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি।
হামলাকারীরা তাকে ব্লেডজাতীয় কিছু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কেটে দেয়। দুজন তাকে মাটিতে ফেলে বুকের ওপর দাঁড়িয়ে মাড়াতে থাকে। তিনি যন্ত্রণায় চিৎকারও করতে পারছিলেন না। কেননা দুজন তার মুখ চেপে ধরেছিল।
মারধরের মধ্যে হামলাকারীরা তার হাতের ব্রেসলেট, কানের দুল, গলার চেইন, ঘরে থাকা প্রায় ৪৫ হাজার টাকা লুটে নেয়। ভাঙচুর করে আসবাবপত্র ও হাড়ি-পাতিল। ভয়ে-আতঙ্কে তার একমাত্র নাতনি (অ্যানির মেয়ে) চিৎকার চেঁচামেচি করছিল।
খবর পেয়ে দোকান থেকে বাড়ি এসে আনোয়ার হোসেন দেখেন, তার স্ত্রী অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। এরপর প্রতিবেশীরা একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে তার স্ত্রীকে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন।
এখানে তিনদিন চিকিৎসার পর ডাক্তারদের অনুরোধ করেই সাহিদা বেগমকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
অ্যানি জানান, বখাটে বিল্লাল তাকে কুপ্রস্তাব দিতো। তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সে আমার ও পরিবারের প্রতি হিংস্র হয়ে ওঠে। তিনি এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। বলেন, যাতে আর কেউ কোনও নারীর ওপর এমন নির্যাতন করতে সাহস না পায় সেজন্য তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
পরিবার ও স্থানীয়দের বক্তব্য
আনোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী সাহিদা বেগম জানান, এটি শুধু নারী নির্যাতন নয়। সংস্কৃতি কর্মীদের ওপর হামলা।
বখাটে বিল্লালের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের মারধরসহ আরও অভিযোগের কথা শোনা গেছে স্থানীয়দের মুখে।
সালিশ বৈঠকে উপস্থিত এবং বিল্লালের চাচা জোহর আলী মাস্টার বিল্লালের অপকর্মের ঘটনায় ভীষণ ব্যথিত। তিনি বলেন, আগে ওর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুনিনি। সে হাতুড়ি দিয়ে প্রথমে মেরেছে এবং সালিশের দিন আবার অ্যানির মায়ের ওপর হামলা ও তার বাড়ি ভাঙচুর করেছে। আমি নিজেই অ্যানির মাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছি। তাদের পাশে থেকেছি। কারও ওপর কোনও অন্যায় হোক আমি তা চাই না। বিল্লালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক-সেটি চাই।
এদিকে, শিল্পী পরিবারের ওপর হামলার ঘটনার পর কেশবপুর উপজেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতকি জোট তাৎক্ষণিক সভা করে। তারা এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এবং দোষীদের আটকে ভূমিকা রাখতে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে।
এই জোটের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মশিউর রহমান বলেন, ঘটনা শোনার পরপরই আমরা সমাবেশ করেছি। অ্যানির পরিবারকে আশ্বস্ত করেছি তাদের পাশে থাকার বিষয়টিও জানিয়েছি। এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে- সে বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমান বলেন, প্রথমদিকের ঘটনায় মীমাংসার চেষ্টা করে বৈঠক করেছিলাম। কিন্তু সেই বৈঠকের পর বিল্লালের এই আচরণ মোটেই মেনে নেওয়া যায় না। আমিও চাই তার উপযুক্ত শাস্তি হোক।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তন্দ্রা ভট্টাচার্য বলেন, অ্যানির মাকে মারধর ও বাড়িতে লুটপাট-ভাংচুরের প্রতিবাদে আমাদের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি যশোরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে স্মারকলিপি দিয়েছে।
তিনি বলেন, সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্র এমনিতেই সংকুচিত হচ্ছে-তার ওপর এ ধরনের আচরণ মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি, তার (বিল্লালের) কোনও বিষয়ে কোনও আপত্তি থাকতো, তবে সে প্রশাসনকে জানাতে পারতো। তা না করে একটি নাচের স্কুল বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হয়নি। তিনি এই ঘটনায় লজ্জা ও ঘৃণা প্রকাশ করে দোষীদের দ্রুত আটক করে আইনে সোপর্দ করার আহ্বান জানান।
এসব বিষয়ে কথা হয় কেশবপুর থানার ওসি শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। একটি সংস্কৃতিমনা পরিবারের ওপর হামলা বরদাশত করা হবে না। ভিক্টিম ও তার পরিবারকে জানিয়েছি, যখনই কোনও প্রয়োজন হয়- পুলিশকে জানাতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেখানে পুলিশের কর্মকর্তারা ফোর্স নিয়ে হাজির হবে।
তিনি জানান, বিল্লাল ও তার পরিবার সদস্যরা বর্তমানে পলাতক রয়েছে। শুনেছি, তারা বাগেরহাট জেলায় অবস্থান করছে। আমরা খোঁজ-খবর নিচ্ছি। তাদের আটকে আমরা কাজ করে চলেছি।
এই প্রতিবেদকের সামনেই ওসি শহিদুল ইসলাম তার এক অফিসারকে নির্দেশ দেন বিল্লাল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের একটি মামলা যাতে অ্যানি করেন সে ব্যবস্থা করতে।
/টিএন/