নীল জলরাশি আর প্রবালের মায়াজালে মোড়া বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। দীর্ঘ নয় মাস প্রতীক্ষার পর আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হচ্ছে দ্বীপটি। আজ সোমবার সকাল ৭টা থেকে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে শুরু হয়েছে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। সেন্টমার্টিন যেতে শীত উপেক্ষা করে ভোর ৫টা থেকে কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া বিআইটিডব্লিউ ঘাটে লাইন ধরছেন পর্যটকরা। দুই সারি থেকে একেকজন করে ট্রাভেল পাস চেক করছে প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা।
পর্যটকদের নিয়ে সকাল ৭টায় কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটি থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজ দুপুরের আগেই পৌঁছে যাবে প্রবালখচিত স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিনে। আগামীকাল মঙ্গলবার বেলা ৩টায় সেই জাহাজ আবার ফিরবে কক্সবাজারে। আজ তিনটি জাহাজ যথাক্রমে এমভি বারো আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলী ও কেয়ারি সিন্দাবাদে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন গেছেন ১১০০ পর্যটক। প্রতিদিন যাবেন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক, দ্বীপের পরিবেশের জন্য সহনীয় এই সীমা ঠিক করে দিয়েছে প্রশাসন।
‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (স্কোয়াব)-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ‘মৌসুমের প্রথম যাত্রার সব প্রস্তুতি আগে থেকেই সম্পন্ন ছিল। প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশে যাত্রা শুরু করা গেছে।’ আগামী মৌসুমে কমপক্ষে চার মাস রাত্রিযাপনের সুযোগ মিললে জাহাজ মালিকরা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ‘পরিবেশ অধিদফতর ও ট্যুরিস্ট পুলিশের কঠোর তদারকিতে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ন্ত্রণ ও প্লাস্টিক ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সচেতনতার অংশ হিসেবে প্রথম দিন যাত্রীদের হাতে অ্যালুমিনিয়ামের পানির বোতল তুলে দেওয়া হয়েছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, ‘আজকে প্রথম দিন থেকে প্রতিটি টিকিট চেক করা হচ্ছে। বিশেষ করে কোনও পর্যটকের হাতে যাতে প্লাস্টিক বোতল না থাকে সে ব্যবস্থা আমরা করছি। মানে একটা শৃঙ্খলায় পর্যটকরা যাতে সেন্টমার্টিন যেতে পারেন সেটা নিশ্চিত করবে ট্যুরিস্ট পুলিশ।’
পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ‘প্লাস্টিক দূষণ কমাতে অ্যালুমিনিয়াম বোতল ব্যবহারে কঠোরতা আনা হয়েছে। এটি সফলভাবে কার্যকর হলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।’
দীর্ঘদিন পর পর্যটকরা প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন যেতে পেরে খুশি অনেকে। তারা বলছেন, এ বছর সেন্টমার্টিন ভ্রমণে এসেছে ব্যতিক্রম।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক দম্পতি সোমা আক্তার ও সাইদুল মনে করেন, ‘সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করতে হবে। এজন্য যারা সেন্টমার্টিন ভ্রমন করবেন তাদের অবশ্য সচেতন হতে হবে। কারণ, সেন্টমার্টিন আমাদের সম্পদ।’
আরেক পর্যটক মসিউর রহমান বলেন, ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপে কয়েকবার যাওয়া হয়েছে। এবারে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ একটু ব্যতিক্রম লাগছে। কারণ, বিভিন্ন বিধি-নিষেধ থাকায় খুব শৃঙ্খলা এসেছে এবারের যাত্রায়।’
গত ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটক প্রবেশ উন্মুক্ত হলেও রাত্রিযাপন নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে এতদিন কোনও জাহাজ চলাচল করেনি। এবারও নুনিয়ারছড়া জেটি থেকে চারটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেয়েছে।
সেন্টমার্টিনের নাজুক প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষায় ঘোষিত ১২ দফা নির্দেশনা এবার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে— রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো নিষেধ, উচ্চ শব্দে অনুষ্ঠান-বারবিকিউ নিষিদ্ধ, কেয়াবনে প্রবেশ বা কেয়াফল সংগ্রহ নিষিদ্ধ, কাছিম-পাখি-রাজকাঁকড়া-প্রবালসহ যেকোনও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সব কার্যক্রম বন্ধ, মোটরচালিত যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ এবং প্লাস্টিকমুক্ত দ্বীপ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদফতর পর্যটকদের বিনামূল্যে অ্যালুমিনিয়াম বোতল সরবরাহ করছে।