ধামরাইয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ‘ধর্ষণ’ হিসেবে ছড়ালো যেভাবে

ঢাকার ধামরাইয়ে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসে এক নারী সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়েছে।  তবে যাকে ভুক্তভোগী বলা হচ্ছে তিনি ও তার কথিত স্বামী বলছেন, কোনও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। ঘটেছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। ১৫ জানুয়ারি ধর্ষণের এ ঘটনাটি ঘটেছে বলে ফেসবুকে সংবাদ ভাইরাল হয়। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধান করে ধর্ষণ সম্পর্কে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শহীদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েও জানতে পারেন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে এবং এ নিয়ে কেউ কোনও অভিযোগ করেনি।

কী ঘটেছিল সেদিন

এনডিই নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ট্রাকচালক আব্দুর রাজ্জাক। একই প্রতিষ্ঠানে দিনমজুর হিসেবে কাজ করা রামরাবন এলাকার কৃষ্ণচন্দ্র মণি দাসের সঙ্গে সখ্যতার সূত্রে সেদিন বিকালে স্ত্রীকে নিয়ে তার বাড়ি বেড়াতে আসবেন বলে জানান রাজ্জাক। সন্ধ্যার দিকে এক নারীকে নিয়ে ধামরাইয়ে কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়ি এসে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। বাড়িতে পর্যাপ্ত থাকার জায়গা না থাকায় কৃষ্ণচন্দ্র তাদের থাকতে দেন একই এলাকা থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে তার বোনের বাড়িতে। আর বোনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। একপর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে আব্দুর রাজ্জাক এসে কৃষ্ণচন্দ্রকে ডেকে তুলে তার স্ত্রীর গহনা, টাকা ও ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান। ঘটনা শুনে সেখানে ছুটে যান কৃষ্ণচন্দ্র ও তার পরিবারের সদস্যরা। সেখানে গিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে জানতে পারেন তারা।

আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রীর বরাত দিয়ে কৃষ্ণ চন্দ্র মণি দাস জানান, তিনি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারেন আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রীর কানের দুল, নাক ফুল, গলার চেইন, ১৭ হাজারের মতো টাকা ও ফোন ছিনিয়ে নেয় অজ্ঞাত পরিচয়ধারী পাঁচ জন ব্যক্তি। এর মধ্যে দুজন আব্দুর রাজ্জাককে মারধর করে।

আব্দুর রাজ্জাক এই বিষয়ে বলেন, ‘আমার স্ত্রী বালিয়াটি রাজবাড়ি বেড়াতে আসেন। বিকালের দিকে আমিও যাই। এরপর আমি রাতে থাকা যাবে কিনা, সেজন্য যোগাযোগ করি কৃষ্ণ চন্দ্র মণি দাসের সঙ্গে। এরপর আমরা রামরাবন আসি। তার বাড়ি আসার পর  রাতে তার বোনের বাড়িতে ঘুমাতে যাই। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এক যুবক এসে দরজা খুলতে বলে। আমার স্ত্রী বলল, দরজা খুলে দিন, আমরা তো চোর নই। আমি দরজা খুলে দিই। এরপর আমাদের পরিচয় ও সম্পর্ক জিজ্ঞেস করে। আমরা বলার পর সে চলে যায়। রাত দেড়টার দিকে পাঁচ জন লোক আবারও এসে দরজা খুলতে বলে। দরজা খোলার পরই তারা বাইরের লাইট বন্ধ করে দেয়। এরপর চার জন ঘরে ঢুকে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করে ও আমার মানিব্যাগ থেকে ১৩০০ টাকা নেয়। আমার স্ত্রীর কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, তার কানের দুল, নাক ফুল, গলার স্বর্ণের চেন ও ১৭ হাজারের মতো টাকা ছিনিয়ে নেয়। তারা আমাকে মারধর করে। এই ঘটনা আমাকে কাউকে জানাতে নিষেধ করে প্রায় পাঁচ মিনিট পর চলে যায়। পরে আমি পুরো ঘটনা কৃষ্ণদাকে জানাই। আর আমি কাউকে চিনতেও পারিনি।’

পাশের বাড়ির বাসিন্দা গৃহবধূ শিল্পী মণি দাস বলেন, ‘রাত ১টার দিকে হঠাৎ মারামারির শব্দ শুনি। এসে দেখি কেউ নাই, শুধু তারা দুজন ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। পরে ওই নারী বললো, তার কানের দুল, গহনা, টাকা, মোবাইল নিয়ে গেছে। আর কাউকে দেখিনি।’

পাঁচ দিন পর ঘটনাটি ধর্ষণ হিসেবে ভাইরাল

১৫ জানুয়ারি ঘটনাটি ঘটার পরপরই সকালে পারিবারিক প্রয়োজনে ওই বাড়ি ত্যাগ করেন আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া সেই নারী। এর চার দিন পর বেশ কয়েকটি পত্রিকায় এ নিয়ে খবর প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘ঢাকার ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক গৃহবধূ। স্বামীকে জিম্মি করে ঘরের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে ওই গৃহবধূকে রাতভর ধর্ষণ করা হয়। সেই সঙ্গে গৃহবধূর কানের দুল, গলার চেন ও হাতের বালাসহ তিন ভরি স্বর্ণের গহনা ছিনিয়ে নেয় ধর্ষণকারীরা। পরে স্বামী-স্ত্রীকে হত্যার ভয় দেখিয়ে বাড়ি ও গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় গত শুক্রবার সকালে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় ইউপি সদস্য নন্টু চন্দ্র মণি দাসসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে বিচার চান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সজীব চন্দ্র মণি দাসসহ উচ্ছৃঙ্খল কিছু যুবক ধর্ষণের শিকার নারী ও তার স্বামীকে লাঠিপেটা করে গ্রাম থেকে বের করে দেয়।’

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা নেপাল চন্দ্র মণি দাস ঘটনাটি স্থানীয় এক কথিত সাংবাদিককে বিষয়টি অবহিত করেন। সেই সাংবাদিকের মাধ্যমেই অপরাপর সাংবাদিকরা তথ্য পেয়ে খবরটি প্রকাশ করেন। সাংবাদিক পরিচয়ে প্রথম তথ্যদাতার নাম আব্দুল মান্নান। তিনি সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে চাঁদাবাজির সময় র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে ধামরাই ও আশুলিয়া থানায় হত্যাচেষ্টাসহ অন্তত চারটি মামলার তথ্য পাওয়া যায়।

বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার পর গা ঢাকা দিয়েছেন আব্দুল মান্নান। একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কল ধরেননি।

ধর্ষণের অভিযোগ সম্পর্কে কী বলছেন আব্দুর রাজ্জাক স্থানীয়রা

ভাইরাল হওয়া খবরের ভিত্তিতে এই বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে পাওয়া যায়নি আব্দুর রাজ্জাককে। এই ঘটনার পরদিন থেকে কর্মস্থলেও অনুপস্থিত তিনি। জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা ধরে তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের তেওতা এলাকায় গিয়ে তার স্ত্রীকে পাওয়া যায়। তবে তিনি জানান, তিনি সেই নারী নন। তিনি কখনও রামরাবন এলাকায়ও যাননি।

ফোনে আব্দুর রাজ্জাকের কাছে ওই নারীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও জবাব দেননি। এর পর থেকে তার ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।

তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া নারীকে ধর্ষণের কিংবা যৌন নিপীড়নের কোনও ঘটনা ঘটেছে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।’

প্রতিবেশী শিল্পী মণি দাস বলেন, ‘আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এই বাড়িতে আসি। তখন কাউকে দেখতে পাইনি। তাদের কাছে এমন কোনও ঘটনাও শুনিনি। বেঁধে রাখতেও দেখিনি। শুধু আব্দুর রাজ্জাককে চড়-থাপ্পড় মারা হয়েছে শুনেছি।’

একই রকম বক্তব্য ঘটনার পরপরই সেখানে আসা বিকাশ চন্দ্র মনি দাসেরও। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমি তাকে কাঁদতে দেখি। তাকে জিজ্ঞেস করি, তখন তিনি গহনা, টাকা, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। তাকে কোনো সম্মানহানি করেছে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি এমন কিছু হয়নি বলে জানান।

তিনি আরও বলেন, আমি তখনই তাকে বলি সকালে পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে অভিযোগ করতে। এতে আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া সেই নারী কেউই রাজি হননি। সকালে তারা আমাদের বাড়ি ছেড়ে যান।

এদিকে, পরের দিন সকালে লোকমুখে এই বিষয়ে জানতে পারেন স্থানীয় বালিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মন্টু চন্দ্র মণি দাস। তিনি বলেন, ‘আমি বৃহস্পতিবার সকালে জানতে পারি, একটা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসে আমি কাউকেই পাইনি। আমার কাছে কেউই আসেনি। কোনও সহযোগিতাও চায়নি। যদি সহযোগিতা চাইতো, আমি অবশ্যই করতাম। তবে ওই সময় যারা উপস্থিত ছিল, বা পরে যারা এসেছে সবাই বলেছে, মালামাল নিয়েছে। কিন্তু আর কোনও ঘটনা ঘটেনি।’

যা বলছে পুলিশ

মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শহীদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান।

ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, ‘সংবাদমাধ্যম ও সূত্রে পাওয়া খবর থেকে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। পরিদর্শনের সময় এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, এখানে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বা কোনও নারীর উপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘যারা এই ঘটনা সংক্রান্ত অভিযোগ করতে চাইবেন, তারা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ধর্ষণ বিষয়ে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইউপি সদস্যের কাছেও বিচারপ্রার্থী হিসেবে কেউ কোনও অভিযোগ জানায়নি। কোনও লোককে বাধা দিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।’

সংবাদমাধ্যমের খবরে উল্লিখিত এসআই হারাধন নামে কোনও এসআই নেই বলে জানান ওসি।

তবে খোঁজ নিয়ে ধামরাই থানায় আরাধন চন্দ্র সাহা নামে একজন এসআই’কে পাওয়া রয়েছেন বলে জানা যায়। তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দেননি বলে জানান।