‘২২ এপ্রিল সুমন ছাত্রলীগের একটি মিছিলে গিয়েছিল। মিছিলটি কামারপাড়া থেকে রসুলপুর ঘাট পর্যন্ত যায়। পরে তারা সেখান থেকে একটি ট্রলার ভাড়া করে আশুলিয়া ঘাটের দিকে গিয়েছিল। আশুলিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর পুলিশ তাদের ধরতে অভিযান চালায়। তখন সাত জনকে আটক করা হয়। আর বাকিরা নদীতে ঝাঁপ দেয়। সুমনও তখন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল বলে তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি।’
ঢাকার তুরাগ নদ থেকে গত ২৫ জুন রাতে উদ্ধার করা মো. সুমনের বিষয়ে জানতে চাইলে এভাবেই বিবরণ দেন তার খালু মো. জুয়েল রানা। সুমনের সঙ্গে থাকা অন্যদের কাছ থেকে এমন বিবরণ শুনেছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার পর ২৩, ২৪ ও ২৫ জুন পর্যন্ত আমরা ট্রলার নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছি। কোথাও তাকে পাইনি। কোনও থানায় সন্ধান মেলেনি। ২৫ জুন রাত প্রায় ১২টার দিকে পুলিশ আমাদের ফোন করে জানায়, একটি সেতুর নিচে একটি মরদেহ পাওয়া গেছে। পরে গিয়ে আমরা সুমনের লাশ শনাক্ত করি।’
গত কয়েকদিন ধরেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেসবুক পেজ বা আইডি থেকে প্রচার করা হয়, তুরাগ থানা এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে বিএনপি নেতাকর্মী ও পুলিশের হামলার পর থেকে সাত নেতাকর্মী নিখোঁজ এবং চার জনের লাশ তুরাগ থেকে উদ্ধার করা হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে তুরাগ নদ সংলগ্ন এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক থানা এবং নৌ-পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।
উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, তাদের আওতাধীন তুরাগ থানা, বাউনিয়া ও বিরুলিয়া পর্যন্ত এলাকায় ২২ জুন থেকে রবিবার পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনও লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি।
তবে ওই সময়ে তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। যে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তারা হলেন- তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার মো. রানা মিয়ার ছেলে মো. সুমন (১৭), একই এলাকার আরিফ হাসান রাকিব (২৫) ও রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা কফিল উদ্দিন মোল্লার ছেলে রনি মোল্লা (৩৫)।
এর মধ্যে গত ২৫ জুন রাত প্রায় ১২টার দিকে সাভারের আশুলিয়া বাজার এলাকায় তুরাগে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয় মো. সুমনের (১৭) লাশ। এ ঘটনায় শুক্রবার আশুলিয়া থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়।
শনিবার রানাভোলা এলাকায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সুমনের বাবা মো. শাহ আলম, মা ও বোন বসে আছেন দুই কক্ষের বাসার একটি কক্ষে। ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা বাকরুদ্ধ। কথা বলতে গেলেও চুপ থাকেন তারা। সান্ত্বনা দেওয়ার পর কথা বলেন। তবে অধিকাংশ প্রশ্নে চুপ থাকেন। সুমন ২২ তারিখ থেকে নিখোঁজ ছিল কিনা, এমন প্রশ্নের কোনও উত্তর দেননি বাবা।
এ সময় আত্মীয়-স্বজনরা কোনও কিছু জিজ্ঞেস না করতে অনুরোধ করেন। নিখোঁজ ছিল, এতটুকু উত্তর দিয়ে তারা জানান, শুক্রবার খবর পেয়ে তারা লাশ নিয়ে আসেন। মোবাইল থেকে সুমনের সব ছবি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। বাসায় থাকা ছবিগুলোও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সুমনের মোবাইল ভেঙে ফেলা হয়েছে। সন্তান হারানোয় মানসিক যন্ত্রণা বাড়বে, তাই কোনও স্মৃতি রাখা হয়নি।
একপর্যায়ে ফেসবুকে সুমন আহমেদ চৌধুরী (ইংরেজিতে) নামের একটি আইডি দেখানো হলে সেটি সুমনের বলে নিশ্চিত করেন পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন প্রতিবেশী। সুমন কামারপাড়া আড়তে কাঁচামালের ব্যবসা করত বলে জানান তারা। ফেসবুক আইডি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছয় দিন আগে সর্বশেষ আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রার ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় দলীয় কার্যক্রমের ভিডিও আপলোড করা হয়।
রবিবারও ওই এলাকায় যান এই প্রতিবেদক। বিকাল ৫টার দিকে রানাভোলা এলাকায় গিয়ে মো. সুমনের পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করলে তার বাবা কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। ওই ফোনেই পরবর্তীতে কথা হয় সুমনের খালু মো. জুয়েল রানার সঙ্গে।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, উত্তরা এলাকার রিকশাচালক রানা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ছোট ছেলে ছিল সুমন। তার বড় ভাই বছর দুয়েক আগে নিখোঁজ হয়। এরপর থেকে এক বোন, সৎভাই ও মাকে নিয়ে ছিল সুমনের সংসার। একটি আড়তে চাকরি করে পরিবারের হাল ধরেছিল। করতো পড়াশোনাও। এর মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটলো। নিখোঁজের পর বিহ্বল সময় কাটিয়েছেন বাবা। আর মরদেহ উদ্ধারের পর পুরোই স্তব্ধ পরিবারটি।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুমন ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিল। শুক্রবার তুরাগ নদ থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ।
জুয়েল রানা বলেন, ‘২২ তারিখের পর আমরা তুরাগ থানায় গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের বলা হয়, ঘটনাটি আশুলিয়া থানার আওতাধীন। পরে সুমনের মাকে এবং পরিবারের আরেক নারী সদস্যকে আশুলিয়া থানায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে কোনও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা নেওয়া হয়নি।’
ঘটনার পর বিস্তারিত না জানানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুরুতে আমরা কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইনি। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। কী হয়েছে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এখন যারা ফোন করছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলছি।’
সুমনের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে চাইলে রানা বলেন, ‘যারা ওই সময় তার সঙ্গে ছিল, তাদের দু–একজনের কাছ থেকেই আমরা ঘটনার বর্ণনা পেয়েছি। তবে তারাও এখন আত্মগোপনে আছে।’
উত্তরায় দাফন
সুমনের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে জুয়েল রানা বলেন, ‘তারা এখন সেই অবস্থায় নেই। মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছেন। পোস্টমর্টেম শেষে ২৬ তারিখ মরদেহ বুঝে পেয়েছি। এরপর প্রশাসনের কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসেনি। পুলিশও না, কোনও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীও না। শুধু সাংবাদিকরাই এসেছেন।’
দাফনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সুমনকে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের পেছনের ধরঙ্গা টেক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। জায়গাটি কামারপাড়া ও রানাভোলার মাঝামাঝি সড়কের পাশে। আমরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। কাউকে চিনি না। কোথায় যাবো, কার কাছে বিচার চাইবো, কী করবো- কিছুই বুঝতেছি না। মামলা কিংবা থানা পুলিশ সম্পর্কেও তেমন ধারণা নেই আমাদের।'
সুমন আগে কখনও রাজনৈতিক মিছিলে গিয়েছিল কিনা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আগে গেছে কিনা, আমরা জানি না। এই ঘটনাতেই প্রথম জানতে পারলাম।'
তিনি বলেন, 'সুমনের ওপরই পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল। সে একটি কাঁচামালের আড়তে কাজ করতো। সারারাত কাজ করতো, আবার পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছিল। আমরা এতটুকুই জানতাম, সে কাজ করে, পড়াশোনা করে। বন্ধু–বান্ধব থাকতে পারে। কিন্তু সে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, এটা আমরা কেউ জানতাম না। এমনটা হবে, আমরা কখনও ভাবিনি। কোনও বাবা–মা কি চাইবেন, তার সন্তানের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটুক?'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা আওয়ামী লীগকে দোষ দিচ্ছি না, বিএনপিকেও দোষ দিচ্ছি না, কাউকেই দোষ দিচ্ছি না। কারণ আসলে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। রাজনীতির সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্কও নেই।'
পরিবারের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে জুয়েল রানা বলেন, 'সুমনের মা–বাবা কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। পুরো পরিবারই সুমনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন আর বলার মতো কিছু নেই।'
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা স্থানীয়দের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদের পাশের এক চক থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করি। পরে নিহত ব্যক্তির পরিবার মরদেহটি সুমনের বলে শনাক্ত করে। গতকাল এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির বড় ভাই অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন ২২ জুন পিকনিকের কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হয়। পরে তুরাগ নদে পড়ে যায়। সে সাঁতার জানতো না। পরিবারের সদস্যরা নদে খোঁজাখুঁজি করেছেন। নদে একটি লাশের কথাই আমরা জানি। আর অন্যান্য যেসব কথাবার্তা আসতেছে, ওগুলোর বিষয়ে আমাদের জানা নাই।’
আরিফের বিষয়ে যা জানা গেলো
‘সে যে রাজনীতি (আওয়ামী লীগের) করতো আমরা জানতাম না। মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও-ছবি দেখানোর পর জানছি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা। আমরা জানি না কীভাবে মারা গেছে। সাঁতার খুব একটা ভালো পারতো না আরিফ। লাশ উদ্ধারের পরও মামলা করতে চাইনি। কিন্তু থানা পুলিশের একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাই মামলা করছি,’ ঢাকার তুরাগ নদ থেকে গেল ২৪ জুন মরদের উদ্ধার করা আরিফের বিষয়ে জানতে চাইলে এভাবেই বিবরণ দেন তার চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম।
গত কয়েক দিন ধরেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেসবুক পেজ বা আইডি থেকে প্রচার করা হয়, তুরাগ থানা এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে বিএনপি নেতাকর্মী ও পুলিশের হামলার পর থেকে সাত নেতাকর্মী নিখোঁজ এবং চার জনের লাশ তুরাগ থেকে উদ্ধার করা হয়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে তুরাগ নদ সংলগ্ন এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক থানা এবং নৌ-পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।
উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, তাদের আওতাধীন তুরাগ থানা, বাউনিয়া ও বিরুলিয়া পর্যন্ত এলাকায় ২২ জুন থেকে আজ রবিবার পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনও লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি।
তবে এই সময়ে তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। যে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তারা হলেন- তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার মো. রানা মিয়ার ছেলে মো. সুমন (১৭), একই এলাকার আরিফ হাসান রাকিব (২৫) ও রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা কফিল উদ্দিন মোল্লার ছেলে রনি মোল্লা (৩৫)।
এর মধ্যে গত ২৪ জুন সকালে ডিএমপির দারুস সালাম থানাধীন এলাকা থেকে আরিফ নামের একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আরিফের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বলেন, ‘২২ জুন বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আরিফ। ওই দিন বিকাল ৪টার একটু আগে মোবাইলে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিল। গত বুধবার তুরাগ নদ থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। সে যে রাজনীতি (আওয়ামী লীগের) করতো আমরা জানতাম না। মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও-ছবি দেখানোর পর জানছি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা। আমরা জানি না কীভাবে মারা গেছে। সাঁতার খুব একটা ভালো পারতো না আরিফ। লাশ উদ্ধারের পরও মামলা করতে চাইনি। কিন্তু থানা পুলিশের একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাই মামলা করছি। বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়ি রংপুরে লাশ দাফন করা হয়েছে।’
তবে তার বোন ও বাবাকে একাধিকবার ফোন করলেও তারা কল ধরেননি।
এ ব্যাপারে শনিবার আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির বলেন, ‘২৪ জুন সকালে আরিফ নামের একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।’
ডিএমপির দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দুলাল হোসেন বলেন, ‘নৌ-পুলিশ গত বুধবার আরিফ নামে একজনের লাশ উদ্ধার করেছিল। এ ঘটনায় নিহতের চাচা অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।’