গ্রাহকদের টাকা নিয়ে উধাও ‘পল্লী উন্নয়ন সংস্থা’

বরিশালবরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ও বাটাজোর ইউনিয়নে সদস্যের ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে পল্লী উন্নয়ন সংস্থা (পিইউএস) নামের একটি এনজিও উধাও হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী কয়েকজন আমানতকারী গৌরনদী থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে। আমানত রাখা সঞ্চয়ের অর্থসহ সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ১২টি গ্রামের প্রায় ২ শতাধিক সদস্য।
স্থানীয় লোকজন ও প্রতারিত কয়েকজন সদস্যর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নড়াইল জেলা সদরের জাহানারা বেগম (৪৫) ও গোপালগঞ্জ জেলা সদরের সালমা আক্তার (২৫) নিজেদেরকে পল্লী উন্নয়ন সংস্থা (পিইউএস) নামের বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উপজেলা সমন্বয়কারী ও মাঠকর্মী পরিচয় দিয়ে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া বাসস্ট্যান্ডের কাছে মো. শাহজাহান খানের বাড়ি ভাড়া নেন।
সংস্থার প্রধান কার্যালয় হিসেবে সাইনবোর্ডে উল্লেখ করা হয়, বি বি অ্যাভিনিউ খদ্দর বাজার শপিং কমপ্লেক্স (৬ষ্ঠ তলা), ৫৮নং রুম, ঢাকা-১০০০। এনজিও রেজিস্ট্রেশন নং- ম/বি/অ-ঢাকা-১৫২/৯৮।

সংস্থার সদস্য ফরমে উল্লেখ রয়েছে, গ্রামের ১৮ থেকে ৪৫ বছরের নারী ও পুরুষ একশ পঞ্চাশ টাকা জমা দিয়ে ফরম পূরণ করে সংস্থার সদস্য হতে পারবেন। সদস্য হওয়ার পর সপ্তাহে ২৫ টাকা সঞ্চয় জমা দিতে হবে। তিন সপ্তাহ অতিবাহিত হলে সমিতির এক তৃতীয়াংশ সদস্যকে ঋণের আওতায় আনা হবে।

ঋণের অনুকূলে কোন জামানত দিতে হবে না, শুধু ঋণ পাওয়ার পূর্বে শতকরা ১০ ভাগ হারে সঞ্চয় আমানত জমা দিতে হবে। গ্রামের হতদরিদ্র মানুষকে ঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার লক্ষে সদস্যদের সামান্য সুদে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখান তারা। এছাড়া সংস্থার সদস্য হওয়ার পরে তিন মাসের মধ্যে মারা গেলে মৃত ব্যক্তির নমিনিকে এককালীন ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হবে এবং ঋণের টাকা মওকুফ হয়ে যাবে বলেও ফরমে উল্লেখ করা হয়।

প্রতারিত কয়েকজন সদস্য জানান, পল্লী উন্নয়ন সংস্থার ২ নারী কর্মকর্তা নিরীহ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ইউনিয়নের মাহিলাড়া, বাঘার, ভিমেরপাড়, কেফায়েতনগর, ও বাটাজোর ইউনিয়নের বাটাজোর, হরহর, বছার, ঘেয়াঘাট, লক্ষকাঠী, জয়সুরকাঠী, চন্দ্রহার, উত্তর পশ্চিম চন্দ্রহারসহ ১২টি গ্রামের ২ শতাধিক লোককে সংস্থার সদস্য করেন। গ্রামের মানুষ প্রলোভনে পড়ে সংস্থাটির সদস্য হন এবং ঋণ পাওয়ার জন্য এককালীন ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা সঞ্চয় আমানত জমা দেন।

প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পী বেগম (৩৫) মাহমুদা খানমসহ (৪৫) অনেকেই বলেন, গত দুই মাস ধরে দুই ইউনিয়নের ১২ গ্রামের ২ শতাধিক সদস্যকে ঋণ দেওয়ার কথা বলে ১০ শতাংশ আমানত হিসেবে প্রায় ২০ লাখ টাকা আদায় করেন এবং গত ১৬ জুন সব সদস্যকে এক সঙ্গে ঋণ দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করেন। সেই অনুযায়ী ঋণ নিতে পল্লী উন্নয়ন কার্যালয়ে এসে দেখা যায় অফিস তালাবদ্ধ ও ওই ২ মহিলা কর্মকর্তা নেই। ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে তারা উধাও হয়ে গেছে।

লক্ষ্মণকাঠী গ্রামের সাইদুল ইসলাম বলেন, ৫০ হাজার টাকা ঋণ পাওয়ার আশায় মুই ৫ হাজার টাকা ধার-দেনা করে জমা দেই। ঋণ পাইলে ব্যাটারি চালিত ভ্যানগাড়ি কিনে চালামু ও পোলাপান লইয়া বাঁচতে পারমু ভাবছিলাম।

সংস্থার সদস্য বছার গ্রামের কৃষক নিহার সরকার (৪৫) বলেন, মোর সব শেষ অইয়া গেছে। প্রতারক এনজিওর লোভে পড়ে ধানের জমিটুকু বন্ধক দিয়ে ২০ হাজার টাকা জমা দেই। আশা ছিল মুই ২ লাখ টাকা ঋণ পেয়ে মাছের পোনার ব্যবসা করমু ও সংসার  চালামু। একইভাবে প্রতারিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন, সত্য রঞ্জন হালদার, আলাউদ্দিন আকন, আরিফ সরদার, মনোয়ারা বেগম, সাহিদা খানমসহ আরও অনেক গ্রামবাসী।

অভিযোগের ব্যাপারে পিইউএসের উপজেলা ব্যবস্থাপক জাহানারা বেগম (৪৫) ও মাঠ সংগঠক সালমা আক্তারের (২৫) সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের অফিসের ও ব্যক্তিগত ৪টি মুঠোফোনই বন্ধ পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে বাড়ির মালিকের ছেলে আলিম খান বলেন, আমার বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত। আমাদের সঙ্গেও প্রতারণা করে ঘর ভাড়া না দিয়ে সংস্থার ২ নারী কর্মকর্তা পালিয়ে গেছেন। ঘর ভাড়ার চুক্তিপত্রের নামে দুই মাস তারা তালবাহানা করে চুক্তি করেননি।

সদস্যদের টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে গৌরনদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আলাউদ্দিন মিলন বলেন, এ ব্যাপারে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। প্রতারক ২ নারীকে ধরার জন্য অনুসন্ধান চলছে।

আরও পড়ুন: শিশু মিলন হত্যায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার 

/এমও/টিএন/আপ-এআর/