দীর্ঘ ১১ বছরের বেশি সময় পরে সম্প্রতি বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনের সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন, ঝালকাঠী-১ (সদর-নলছিটি) আসনের সাবেক এমপি ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, পটুয়াখালীর-২ (বাউফল) আসনের সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদার দলে ফিরেছেন। তবে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের সাবেক এমপি শহিদুল হক জামালকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি। গুঞ্জন রয়েছে সাবেক এমপিদের আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার জন্য দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরে আসা প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবর রহমান সরোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘সংস্কারপন্থী এসব নেতাকে অনেক আগেই দলে ফিরিয়ে আনা উচিত ছিল। দীর্ঘ সময়ে তারা অন্য কোনও দলে যোগ দেননি। অনেক বছর ধরেই তারা বিএনপিতে আসার চেষ্টা করছিলেন। জাতির বৃহৎ স্বার্থে গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে সবাই ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে সাবেক ওই সব নেতাদের ডাকা হয়েছে। ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের লড়াইয়ে এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’
২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে দলে ফেরেন সাবেক মন্ত্রী আলমগীর কবির, সাবেক হুইপ আবু ইউসুফ মো. খলিলুর রহমান, আবু হেনা, জিএম সিরাজ, সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, নজির হোসেন, ডা. জিয়াউল হক, আতাউর রহমান আঙ্গুর, ইলেন ভুট্টো, শফিকুল ইসলাম তালুকদার, শহিদুল আলম তালুকদার ও জহির উদ্দিন স্বপন।
জাতীয় নির্বাচনের মুহূর্তে সংস্কারপন্থী এসব নেতা দলে ফিরে আসায় চিন্তিত বরিশাল-১ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান এবং জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান। ওয়ান ইলভেনের সময় দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগে বহিষ্কার হন সাবেক সংসদ সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপন। তিনি ওই সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ছিলেন। জহির উদ্দিন স্বপন ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল হাসানাত আবদুল্লাহকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের সময় জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে হাত মেলানোর অভিযোগে গত প্রায় ১১ বছরের বেশি সময় দলের বাইরে ছিলেন। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয় উত্তর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহানকে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার মো. ইউনুসের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন সোবাহান। ২০১০ সালে উত্তর জেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটিতে সহ-সভাপতি করা হয় সোবাহানকে। সোবাহান এবারও দলীয় টিকেট পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। এখানে বিএনপির এমপি প্রার্থী হতে মাঠে রয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার বিএনপির মহাসচিবের সঙ্গে সংস্কারপন্থিদের বৈঠকের পর হিসাব পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে সাবেক এমপি সংস্কারপন্থি জহিরউদ্দিন স্বপনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। আর এমনটা হলে আকন কুদ্দুস দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হতে পারেন।
সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূলত আন্দোলন সংগ্রামকে বেগবান করতেই আমরা দলে ফিরেছি। এর সঙ্গে নির্বাচনের বিষয়টিও আছে। কারণ নির্বাচনের বাকি এক মাস। আন্দোলনের বিষয়টির সঙ্গে নির্বাচনও তো জড়িত।’
আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন,‘আমি মনে করি জিয়া পরিবারের সঙ্গে যারা বেঈমানি করেছে তারা কোনও দিন ভালো হবে না। কারণ যারা একবার বেঈমানি করে তারা বার বারই বেঈমানি করবে। তৃণমূলের মতামতের বাইরে গিয়ে কোনও কিছু করার চেষ্টা করলে সেটা তৃণমূলই প্রতিহত করবে।’
ঝালকাঠী-১ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবুল হক নান্নু ও ঝালকাঠী জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মিঞা আহমেদ কিবরিয়া। এ আসনে এ দুজনই রয়েছেন শঙ্কায়। কারণ ওই আসনের সাবেক এমপি ও সাবেক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইলেন ভুট্টোও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এ আসনে পুনরায় ইলেনকেই মনোনয়ন দিতে পারে দলটি। ইলেন প্রয়াত এমপি জুলফিকার আলী ভুট্টোর স্ত্রী। আর ওই আসনে ভুট্টোর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। এ কারণে ২০০১ সালে এখানে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয় ভুট্টোর সহধর্মিনী ইসরাত সুলতানা ইলেনকে। তিনি বিপুল ভোটে বর্তমান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর তাকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কিন্তু বিএনপির দুর্দিনে ইলেনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারপরেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেনকে এখানে প্রার্থী করতে পারে বিএনপি। কারণ দলের বাইরেও ভুট্টো পরিবারের ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক রয়েছে।
পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনের সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদার দলে ফেরায় এ আসন থেকে টেনশনে রয়েছেন বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বাউফল উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার একেএম ফারুক আহমদ তালুকদার এবং কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক মনির হোসেন। ওয়ান ইলেভেনের পর ওই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আসম ফিরোজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আহমেদ। আগামী সংসদ নির্বাচনে ওই আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ইঞ্জিনিয়ার ফারুক ও মনির হোসেন। তবে সাবেক এমপি শহিদুল আলম দীর্ঘ ১১ বছর পর দলে ফিরে আসায় তাদের মধ্যে কিছুটা টেনশন কাজ করছে। ওই ১১ বছর দলের কর্মকাণ্ড থেকে একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিলেন শহিদুল আলম। এ কারণে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে আন্দোলন-সংগ্রামে যারা ছিলেন এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশানুযায়ী প্রার্থী দেওয়া উচিত বলে মনে করেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।
গৌরনদী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মঞ্জুর হাসান মিলন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জাতীয়তাবাদী শক্তিকে গতিশীল করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যৎ আন্দোলনে গতি আনতে পর্যায়ক্রমে সবার সঙ্গে আলোচনা চলছে। আপাতত মনোনয়নের কোনও বিষয় আমরা দেখছি না। তবে দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি যখন আসবে তখন হাইকমান্ড আন্দোলন সংগ্রামে যারা দীর্ঘ বছর মাঠে ছিলেন তাদের গুরুত্ব দেবে বলে আমি মনে করি।’
গৌরনদী পৌর বিএনপির সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচন কে করবে, কে করবে না সেটা এখন মুখ্য বিষয় নয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ম্যাসেজ হলো আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি। আগামী নির্বাচনের জন্য ৭টি শর্ত রয়েছে। সেই শর্ত মেনে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলে সেখানে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে। যখন মনোনয়নের প্রশ্ন আসবে তখন হাইকমান্ড বিচার-বিশ্লেষণ করেই প্রার্থী চূড়ান্ত করবে। আমাদের দায়িত্ব হলো হাই কমান্ডের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা। একই উক্তি করেছেন ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তফা কামাল মন্টু ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম নুপুর এবং পটুয়াখালী জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরোয়ার কালামসহ স্থানীয় নেতারা।’