বরিশালের আগৈলঝাড়া ছোটমনি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদ জানান, গত ১৬ বছরে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা থেকে মানসিক প্রতিবন্ধী নারীর জন্ম দেওয়া ৩০ নবজাতকের ঠাঁই হয়েছে বরিশাল বিভাগীয় ছোটমনি নিবাসে। সন্তান জন্ম দেওয়া নারীরা সবাই ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করা এসআই নাজমুল হুদা বলেন, গত ২৩ অক্টোবর গভীর রাতে দপদপিয়া সড়কের পাশে এক মানসিক প্রতিবন্ধী নারী সন্তান প্রসবের যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। স্থানীয় এক নারী বিষয়টি দেখতে পেয়ে ওই প্রতিবন্ধী নারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে ভর্তি করান। ওই রাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। মা ও নবজাতকের দেখভালের জন্য সেখানে পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। মা ও শিশু সুস্থ হওয়ার পর নবজাতককে হস্তান্তর করা হয় বরিশালের আগৈলঝাড়ায় বিভাগীয় ছোটমনি নিবাসে। আর মাকে মানসিক ওয়ার্ডে রাখা হলেও পরে সেখান থেকে চলে যায়।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ভর্তি করার পর মা ও শিশু অসুস্থ থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও মেডিক্যালের সমাজসেবা থেকে সব ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় তাদের। সুস্থ হওয়ার পর নবজাতককে হস্তান্তর করা হয় ছোটমনি নিবাসে। মানসিক প্রতিবন্ধী মাকে মানসিক ওয়ার্ডে রাখা হলেও সেখানে কোনও চিকিৎসক এবং জনবল না থাকায় তাকে সেভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ জন্য ওয়ার্ডটিকে স্বাবলম্বী করার দাবি জানান তিনি।
পিরোজপুর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা জাকির হোসেন হাওলাদার জানান, গত আগস্ট মাসে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে শাবনুর নামে এক মানসিক প্রতিবন্ধী নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করালে কন্যাসন্তান প্রসব করেন। হাসপাতালে নবজাতকের নাম রাখা হয় কুলসুম। সন্তান প্রসবের পরে ওই মা চলে যান। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষর মাধ্যমে সমাজসেবা দফতরকে জানানো হলে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হই। পিরোজপুরের শিশু আদালত নবজাতক কুলসুমকে বরিশাল বিভাগীয় ছোটমনি নিবাসে লালন-পালনের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক কুলসুমকে ছোটমনি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়কের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পিরোজপুর সমাজসেবা দফতর সূত্র থেকে জানা গেছে, মানসিক প্রতিবন্ধী এক নারী ইতোপূর্বে আরও দুইবার নির্যাতনের শিকার হয়ে সন্তানের জন্ম দেন। তবে দুটি সন্তান পরে কে বা কারা নিয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাজসেবা দফতরের কর্মীরা জানতে পারেন। নারীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তাকে পাওয়া গেলে তার নিরাপত্তার জন্য বরিশাল নিরাপদ আবাসনে পাঠানো হবে।
এছাড়া পটুয়াখালীতেও ধর্ষণের শিকার হয়ে এক মানসিক প্রতিবন্ধী নারী সন্তান জন্ম দেন। পরে তার ঠাঁই হয় ছোটমনি নিবাসে।
বরিশালের আগৈলঝাড়া ছোটমনি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ২০০৩ সালের জুলাই মাসে ছোটমনি নিবাসের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৬ বছরের ব্যবধানে ওই নিবাসে ১৩৩ শিশু লালন-পালন করা হয়। এরমধ্যে ৩০ শিশু ছিল, যারা যৌন নির্যাতনে মানসিক প্রতিবন্ধীদের গর্ভে জন্ম নেওয়া। বর্তমানে নিবাসে ২১ শিশু রয়েছে। বাকিদের পুনর্বাসন করা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর বরিশাল জেলার সহ-সভাপতি হেনরী স্বপন বলেন, মানসিক প্রতিবন্ধী নারীরা আমাদের আশপাশের কিছু নরপশুর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যা বিভিন্ন সময় তাদের গর্ভধারণ এবং সন্তান প্রসবের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। বিষয়টি দুঃখজনক, এজন্য সরকার থেকে তাদের নিরাপত্তায় এগিয়ে আসা উচিত।
তিনি আরও বলেন, সরকার থেকে মানুষের সামাজিক নিরাপত্তায় বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প রয়েছে। এদেরও ওই সব প্রকল্পের আওতায় এনে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
এ বিষয়ে বরিশাল সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক আল মামুন তালুকদার বলেন, সড়কে থাকা মানসিক প্রতিবন্ধী নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি। এরপর তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান সড়কে থাকা মানসিক প্রতিবন্ধী নারীদের ধর্ষণের বিষয়ে বলেন, ইতোমধ্যে আমি প্রতিবন্ধী মানসিক নারীদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে সমাজসেবা দফতরের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য বয়স্ক সেন্টার অথবা ভবঘুরে সেন্টারে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি যাতে দ্রুত করা যায় সে জন্য সমাজসেবা দফতরের সঙ্গে আবারও কথা বলবেন বলে জানান তিনি।