বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তিতে জালিয়াতি

বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ভর্তি পরীক্ষায় ৮ জন পরীক্ষার্থীকে অতিরিক্ত নম্বর প্রদান করে চান্স পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টি ৫ বছর পর আদালতে প্রমাণ হয়েছে। এ কারণে ৮ শিশু ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এসএম আব্দুল্লাহ নামের অভিভাবকের দায়ের করা মামলার কারণে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে।

জানা যায়, ২০১৫ সালে এসএম আব্দুল্লাহর কন্যা সৈয়দা তাসনিয়া বিনতে আব্দুল্লাহ ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরীক্ষার ফলাফলে তাসনিয়া ফেল করে (ভর্তি রোল-১০৪৪)। কিন্তু মেয়ের ফেলের বিষয়টি মানতে পারেননি বাবা। এমনকি শিশু পরীক্ষার্থী তাসনিয়ারও আত্মবিশ্বাস ছিল সে ফেল করতে পারে না, তাকে ফেল করানো হয়েছে। মেয়ের কান্না দেখে ভেঙে পড়েন বাবাও।

এরপর ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বরিশাল সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন বাবা সএম আব্দুল্লাহ। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সব কাগজপত্র পর্যালোচনা করে বিচারক কাজী কামরুল ইসলাম দীর্ঘ ৫ বছর পর ২ নভেম্বর বাদীর পক্ষে রায় দেন।

মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) বিকালে ওই রায়ের সার্টিফায়েড কপি (সহি মোহর নকল) হাতে পান বাদী জেলা জজ আদালতের আইনজীবী এসএম আব্দুল্লাহ। রায়ে আদালত ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৮ ছাত্রীকে একটি প্রশ্নের ভুল উত্তর দেওয়ার পরও তাদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে ধরা পড়ে। একইসঙ্গে বাদীর মেয়ে সৈয়দা তাসনিয়া বিনতে আব্দুল্লাহ বর্তমানে যে শ্রেণিতে অধ্যায়নরত আছে, সেই শ্রেণিতে তাকে ভর্তি করার নির্দেশ দেন আদালত।

সৈয়দা তাছনিয়া বর্তমানে সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত।

আদেশে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভর্তি কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক, ভর্তি কমিটির সদস্য সচিব ও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ভর্তি কমিটির সদস্য সরকারি বিএম কলেজের অধ্যক্ষ, বরিশালের সিভিল সার্জন এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে আদালতের এই আদেশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়ের সার্টিফায়েড কপিতে (সহি মোহর নকল) উল্লেখ রয়েছে, ২০১৫ সালে মামলা দায়েরের পর আদালত দিবা শাখার ১২০টি খাতা তলব করেন। পরে খাতাগুলো নিরীক্ষা করে দেখা যায় গণিত বিষয়ের ১৯ ক্রমিকে ৪ নম্বরের একটি অঙ্ক ছিল এবং প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৪। সঠিক উত্তর না লেখার পরও যারা নিরীক্ষক ছিলেন তারা ৮ ছাত্রীকে ৪ এর মধ্যে ৪ নম্বর দেন।

উত্তরপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নাফিসা এশা, আয়েশা সিদ্দিকা আফিয়া, সাজিয়া ইসলাম দিপা, জাকিয়া আকতার, হুমায়রা ইসলাম, তানিশা মেহজাবীন, রায়তা রহমান ও নাবিলা ইসলাম ১৯ নম্বর প্রশ্নের উত্তর ভুল করার পরও তাদের প্রত্যেককে ৪ নম্বর করে দেওয়া হয়।

ওই বছর প্রভাতী শাখায় সর্বনিম্ন নম্বর ছিল ৩৯ দশমিক ২৫ এবং দিবা শাখায় সর্বনিম্ন নম্বর ছিল ৩৭ দশমিক ২৫। যদি ৪ নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া না হতো তাহলে নাফিসা এশার নম্বর দাঁড়ায় ৩৮, আয়েশা সিদ্দিকা আফিয়ার ৩৮, সাজিয়া ইসলাম দিপার ৩৭.৫০, জাকিয়া আকতারের ৩৭.২৫, হুমায়রা ইসলামের ৩৮, তানিশা মেহজাবিনের ৩৭.৫০, রায়তা রহমানের ৩৭.৫০ এবং নাবিলা ইসলাম রাজিতার ৩৬.২৫। অথচ বাদীর মেয়ের প্রাপ্ত নম্বর ৩৮.৭৫। ৮ জনের প্রাপ্ত নম্বরের চেয়ে বাদীর মেয়ে বেশি পেয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

এ ব্যাপারে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাবুবা হোসেন বলেন, ‘পরীক্ষকরা খাতা মূল্যায়ন করার পর ১০ জন সরকারি কর্মকর্তা নিরীক্ষা করেন; সুতরাং এখানে এমনটা হওয়ার সুযোগ নেই। আমার মনে হয় বিষয়টি অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাহলে আদালত কি ভুল করেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাখা আমার কাছে নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা সন্ধিহান। যেটা বলা হচ্ছে তা ঠিক না।’

জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, ‘কাগজপত্র হাতে না পেয়ে আমি কোনও মন্তব্য করতে পারবো না। তাছাড়া এ ধরনের একটি মামলা হয়েছে তাও আমার নলেজে নেই।’

বাদী অ্যাডভোকেট এসএম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তিতে অনিয়ম হয়েছে তা আদালতে প্রমাণ হয়েছে। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীকে অনুত্তীর্ণ দেখিয়ে আর যাতে কোনও শিক্ষার্থীকে বঞ্চিত করা না হয়। ভর্তি অনিয়মের কারণে আর যাতে কোনও মায়ের বা শিক্ষার্থীর চোখে অশ্রু না ঝরে। এই রায় সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।’

প্রসঙ্গত, বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির প্রথম প্রমাণ মেলে ২০১২ সালে। ওই বছর অবৈধভাবে ৩৬ মেধাবীকে বাদ দিয়ে অমেধাবী ৩৬ জনকে ভর্তি করা হয়। ওই বছর জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন এসএম আরিফুর রহমান। বিষয়টি মিডিয়ায় এলে ৩৬ জনকে বাদ দিয়ে নতুন করে ৩৬ জনকে ভর্তি করা হয়।