দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হলেও কবর থেকে উত্তোলন হওয়া এক গৃহবধূর ভিসেরা স্যাম্পল ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়নি। ময়নাতদন্ত শেষে শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরেই পড়ে রয়েছে ওই স্যাম্পল। এ বিষয়ে সেখানকার ডোম বানারীপাড়া থানায় দশবারের বেশি সময় যোগাযোগ করেও কোনও জবাব পাননি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমান বলছেন এখনও রিপোর্ট আসেনি। আর ফরেনসিক বিভাগ বলছে তাদের কাছে ওই গৃহবধূর ভিসেরা স্যাম্পলই জমা পড়েনি।
সংশ্লিষ্টরা স্যাম্পল জমা না হওয়ার পেছনে তদন্ত কর্মকর্তার গাফিলতিকেই দায়ী করছেন।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বাকপুর গ্রামের মমতাজ বেগমের (৬৫) ভিসেরা স্যাম্পল নিয়ে এ অবস্থা চলছে। তিনি ওই গ্রামের মৃত কাজী মোশারেফ হোসেনের স্ত্রী।
বাদী নিহতের ছেলে জুয়েল কাজী বলেন, এ বছরের ৫ এপ্রিল সকালে ঘরের পেছনে একটি পানিশূন্য ডোবা থেকে মায়ের লাশ উদ্ধার করা হয়। মাকে যারা গোসল করিয়েছেন তারা জানান মায়ের মাথা থেকে মগজ বের হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া দাঁতেও আঘাতের চিহ্ন ছিল। এমনকি তার মুখমন্ডল ফোলা ছিল। মৃত্যুকালে তার মায়ের কানে ৪০ হাজার টাকা মূল্যের সোনার দুল ছিল। তাও পাওয়া যায়নি।
জুয়েলের ধারণা তার মাকে হত্যা করে ওই স্থানে ফেলে রাখা হয়। এ জন্য গত ২৭ মে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর অভিযোগ দিয়ে মামলা দায়ের করেন তিনি। ওই মামলায় ১৩ জনকে সাক্ষী করে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়। মামলাটি গ্রহণ করে আদালতের বিচারক লাশ উত্তোলনের নির্দেশ দেন।
২৭ জুন বানারীপাড়ার ইউএনও, এসিল্যান্ড এবং ওসির উপস্থিতিতে লাশ উত্তোলন করে মর্গে পাঠানো হয়। এরপর ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জুয়েল আরও বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমানকে রিপোর্টের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান যতা সময়ে তা পেয়ে যাবো। তবে সাড়ে তিন মাস পার হলেও রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। এরপর মেডিক্যালের ফরেনসিক বিভাগে যোগাযোগ করি তারাও বলেন রিপোর্ট আসেনি। পরবর্তীতে ফরেনসিক বিভাগ থেকে জানানো হয় মায়ের ভিসেরা স্যাম্পলই জমা দেওয়া হয়নি।
এরপর আবার এসআই ওসমানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তখনও তিনি তাকে জানান রিপোর্ট না আসলে কীভাবে দেবেন। ঢাকা থেকে ফরেনসিক বিভাগে রিপোর্ট আসেনি। তার কাছে খবর রয়েছে।
তবে শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডোম বিজয় বলেন, মমতাজ বেগমের ময়নাতদন্ত শেষে ভিসেরা স্যাম্পল পুলিশ নেয়নি। এ জন্য বানারীপাড়া থানার বকশি থেকে শুরু করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমান সাহেবকে কমপক্ষে ১০ বার ফোন করে স্যাম্পল নেওয়ার অনুরোধ করেছি। এতে তারা বিরক্ত হয়েছেন। সর্বশেষ গত পরশু (৭ অক্টোবর) বকশিকে ভিসেরা স্যাম্পল নেওয়ার জন্য বলেছি।
ফরেনসিক বিভাগ সূত্র জানায়, ভিসেরা স্যাম্পল দীর্ঘদিন হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্বাভাবিক। ওই ভিসেরা স্যাম্পল ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন তৈরি হয়। পরে রিপোর্ট সেখান থেকে পুলিশের কাছে সরবরাহ করা হয়। সারাদেশ থেকে ঢাকায় ভিসেরা স্যাম্পল যাওয়ায় একটি রিপোর্ট পেতে কমপক্ষে আড়াই থেকে তিনমাস সময় লাগে। আর মমতাজ বেগমের ভিসেরা স্যাম্পলই জমা দেওয়া হয়নি। এ কারণে তার রিপোর্ট দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বানারীপাড়া থানার ওসি হেলাল উদ্দিন বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমানের ধারণা ছিল ডোমরা ফরেনসিক বিভাগে ভিসেরা স্যাম্পল সরবরাহ করবে। এ কারণে তিনি খবর রাখেননি।
ওসিকে প্রশ্ন করা হয় ডোম আপনার থানার বকশি ও এসআই ওসমানকে ১০ বার ফোন করে ভিসেরা স্যাম্পল নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তাতে সায় দেওয়া হয়নি কেন, জবাবে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে ওসি বলেন, আমি দীর্ঘ তিন মাস ছুটিতে ছিলাম এ কারণে সমস্যাটি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন বলে জানান তিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমানের কাছে ভিসেরা স্যাম্পলের রিপোর্টের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্ট আসেনি। এত সময় কেন লাগছে প্রশ্ন করা হলে বলেন, এতে সময় লাগে। রবিবার ফরেনসিক বিভাগে গিয়ে বিষয়টি জানবেন এবং প্রতিবেদন আনার ব্যবস্থা করবেন বলে জানান তিনি। এ সময় তিনি ভিসেরা স্যাম্পল ডোম ঘরে পড়ে থাকার বিষয়টি এড়িয়ে যান।