এমন ধুমধামে বিয়ে হবে স্বপ্নেও ভাবেননি তারা

জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে ধুমধামে বিয়ে দেওয়া হলো বরিশাল সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের দুই তরুণীকে। এর মধ্যে বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীর সঙ্গে জীবনের জুটি বাঁধলেন কথা বলতে পারা তরুণ। আর বাকপ্রতিবন্ধী তরুণের সঙ্গে জুটি বাঁধলেন কথা বলতে পারা তরুণী। যাতে দাম্পত্য জীবনে একে-অপরের ভাষা ও কথা বুঝতে এবং সহায়তা করতে পারেন।

শনিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে বরিশাল নগরের রূপাতলীর সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে এমন ব্যতিক্রমী বিয়ের আয়োজন করা হয়। তিন লাখ টাকা করে দেনমোহরে বাকপ্রতিবন্ধী সৃষ্টি আক্তারের সঙ্গে ওবায়দুল মৃধা এবং বাকপ্রতিবন্ধী রেজাউল করিমের সঙ্গে তানজিলা আক্তারের বিয়ে দেওয়া হয়।

তাদের বিয়ের আয়োজন ঘিরে সকাল থেকে পুনর্বাসন কেন্দ্রকে সাজানো হয়। বর-কনের জন্য তৈরি হয় প্যান্ডেল এবং অতিথিদের জন্য খাবারের স্থান। স্বর্ণ-গয়না ও কাতান শাড়ি পরেন দুই কনে। পাঞ্জাবি ও শেরওয়ানি পরেন দুই বর। যথারীতি কনের বোনেরা (পুনর্বাসন কেন্দ্রের অন্যান্য তরুণী) হাত ধোয়া থেকে শুরু করে জুতা লুকিয়ে টাকা আদায় করেছেন বকশিশ। এরপর দুই কনেকে বরের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

রূপাতলীর সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে এমন ব্যতিক্রমী বিয়ের আয়োজন করা হয়

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. আমিন উল আহসান, কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কর কমিশনার তাসনিমা হোসেন লুনা, কর কমিশনার কাজী লতিফুর রহমান, বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার, পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ভোলার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিক-ই-লাহী চৌধুরী, পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আল মামুন তালুকুদার হোসেন, বরিশাল সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রিন্টু, শহিদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন, বিসিসির পরিচালক আলমগীর হোসেন আলো, সমাজসেবক মাহমুদুল হক খান মামুন ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রবেশন অফিসার সাজ্জাদ পারভেজ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ৩০০ অতিথিকে আপ্যায়ন করা হয়।

অনুষ্ঠান শেষে দুই বরকে স্বাবলম্বী হতে এনবিআর চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা করে ৪০ হাজার টাকার দুটি অটোরিকশা উপহার দেওয়া হয়। একইসঙ্গে স্বামীকে যেন সহয়তা করতে পারে সেজন্য দুই নববধূকে দেওয়া হয় দুটি সেলাই মেশিন। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া ৫০ হাজার টাকা নববধূদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রবেশন কর্মকর্তা সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘তানজিলা আক্তারের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার তুলাতলি এলাকায় আর সৃষ্টি আক্তারের বাড়ি বরিশাল সদর উপজেলার পলাশপুর এলাকায়। তিন বছর আগে পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসেন তারা। এরপর থেকে তাদের সেলাইসহ এখানে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিক ও সামাজিকভাবে তাদের আজ বিয়ে দেওয়া হলো।’

সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘দাম্পত্য জীবনে যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য দুই বরকে দুটি অটোরিকশা উপহার দেওয়া হয়েছে। তারা অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন আয় করতে পারবেন। স্বামীদের পাশাপাশি যাতে ঘরে বসে আয় করতে পারেন সেজন্য স্ত্রীদের দুটি সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টি ও তানজিলা সেলাই মেশিন চালনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কাজে পারদর্শী। আশা করছি তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হবে।’

সাজ্জাদ পারভেজ আরও বলেন, ‘তানজিলাকে বরিশাল মেট্রোপলিট্ন পুলিশের মাধ্যমে এবং সৃষ্টিকে পটুয়াখালী পুলিশের মাধ্যমে আমাদের কাছে দেওয়া হয়। ওই সময় থেকে তাদের অভিভাবকের সন্ধান চাওয়া হয়। কিন্তু কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে আবারও তাদের সন্ধান চাওয়া হয়। তখন সৃষ্টি ও তানজিলার অভিভাবকদের খোঁজ পাওয়া যায়। তারাও আজ বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বরকনেকে দোয়া করেছেন।’

পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাদের বিয়ের আয়োজন

বিয়ের অনুষ্ঠানে স্বজনদের দেখে কেঁদেছেন তানজিলা ও সৃষ্টি। তারা জানিয়েছেন, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিনটিতে স্বজনদের পাশে পাবেন কখনও আশা করেননি। এমনকি ধুমধামে বিয়ে হবে স্বপ্নেও ভাবেননি তারা।

বর রেজাউলের মা বলেন, ‘বিয়েতে কিছু পাবো সেজন্য ছেলেকে বিয়ে করাইনি। আল্লাহর দিকে চেয়ে অসহায় এক মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছি। আমার ছেলেও বিয়েতে মত দিয়েছে। এখন ধুমধামে বিয়ে হয়েছে। আমি দোয়া করেছি, তাদের জীবন সুখের হোক।’

এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার থাকাকালীন সামাজিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের মেয়েদের জন্য কিছু করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সেসময় তা করা সম্ভব হয়নি। যখন শুনেছি, এখানকার দুটি মেয়ের বিয়ে হচ্ছে তখনই তাদের জন্য কিছু একটা করার চিন্তা করি। এজন্য কিছু উপহার দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই কেন্দ্রে আরও মেয়েরা রয়েছে। তাদেরও ধুমধামে বিয়ে দিতে হবে। এজন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। সেইসঙ্গে সমাজের সবাইকে এসব মেয়েদের স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে।’