পটুয়াখালী-৩ আসনে আ.লীগ ভোটারদের সমাদর তোলায় তোলায়

পটুয়াখালীর-৩ (দশমিনা-গলাচিপা) আসনে বিএনপি জোটের গণঅধিকার, বিদ্রোহী, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের লড়াই জমে উঠেছে। এখানে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও এখানে সমীকরণ পাল্টে দেবে দলটির ভোটাররাই। তাদের ওপরেই অনেকটা নির্ভর করছে এ আসনের ফলাফল। এখানকার আওয়ামী লীগের ভোটারদের প্রার্থীরা সমাদর করছেন। সব প্রার্থীই অপর প্রার্থীকে আওয়ামী লীগ বিরোধী এবং নিজেকে ‘কাউকে নির্যাতন করিনি’ হিসেবে তুলে ধরছেন। মোট কথা এ আসনের আওয়ামী লীগের ভোটারদের দাম এখন তোলায় তোলায়। 

বিএনপির সমঝোতার প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর (ট্রাক), বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন (ঘোড়া), জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মু শাহ আলম (দাঁড়িপাল্লা) ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি আবু বকর সিদ্দীক (হাতপাখা) দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

শুরু থেকেই এ আসনটি আলোচনার কেন্দ্রে। এখানে বিএনপি সমর্থিত নুরুল হক নুর ও দলের বিদ্রোহী হাসান মামুন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন। মাঠপর্যায়ে দুপক্ষই শক্ত অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি প্রচারণা ও ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিস্থিতি এখনও অনেকটা উত্তপ্ত। তবে তাদের ভোট ভাগাভাগির সুযোগ নিতে পারে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন।

আসনটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ভোটারদের বড় একটি অংশ ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামীপন্থি। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হাসান মামুনের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিপি নূর আওয়ামী লীগবিরোধী বলে বিভিন্ন মন্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। 

এতে তার আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা। তবে ডাকসুর মতো ‘নীরব’ ভোটের বড় একটা দখল করে আছেন নুরুল হক নুরের ট্রাক।

প্রচার-প্রচারণা শেষ হলেও আসনটির বাজারে বাজারে এখন ট্রাক ও ঘোড়া প্রতীক নিয়ে আলোচনা করছেন ভোটাররা। গলাচিপা উপজেলার আমখোলা ইউনিয়নের একজন ভোটার ইমরান হোসেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকও, মাঠের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।

এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এলাকায় নুরের ট্রাকের যে ভোট নাই বিষয়টি এমন না, ট্রাকের ভালো ভোট আছে। দূর থেকে দেখে আপনারা বুঝবেন না।’

হাসান মামুনের ঘোড়ার জন্য কাজ করছে সাত্তার চেয়ারম্যান ও সিদ্দিক চেয়ারম্যানসহ বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এতে মানুষ প্রকাশ্যে হাসান মামুনের পক্ষে থাকলেও একশ্রেণির সাধারণ মানুষ ট্রাকে ভোট দেবেন। তাদের কাড়াকাড়িতে আবার দাঁড়িপাল্লা অথবা হাতপাখার প্রার্থী বিজয়ীও হতে পারেন।

দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখা কিন্তু বসে নাই, তারাও প্রচারণায় নিজেদের তুলে ধরেছেন। এ আসনে চার প্রার্থীর কমবেশি ভোট আছে, অতএব প্রার্থীদের মধ্যে বেশি ভোটের ব্যবধান হবে বলে না।

গোলখালী এলাকায় কথা হয় ৬০ বছর বয়সী শিক্ষক রেজাউল করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই আসনে এবার বিএনপির ধানের শীষের ব্যালট নেই, আছে জোটের প্রার্থী। আবার নৌকা প্রতীক বা আওয়ামী লীগের কোনও প্রার্থীও নেই। এই আসনের বড় একটা অংশ আওয়ামী লীগের ভোটার। এর মধ্যে একটা অংশ ভোট দিতে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’ 

আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছ নুরুল হক নুরকে আওয়ামীবিরোধী হিসেবে তুলে ধরছেন হাসান মামুন। এতে আওয়ামী লীগের কিছু ভোট ঘোড়ায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে বিএনপির একটা অংশ হাসান মামুনের ঘোড়া প্রতীকে সমর্থন দিচ্ছে জোরালোভাবে। মাঠে আওয়ামী লীগের মতোই তারা প্রভাব খাটাচ্ছে। সাধারণ ভোটাররা এই প্রভাব পছন্দ করছেন না। তার বিপরীতে থাকা ট্রাক, হাতপাখা ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গলাচিপার বিভিন্ন এলাকায় ভ্যানগাড়িতে আখের রস বিক্রি করেন আলমগীর হোসেন (৪৫)। তার বাড়ি উলানিয়া খালগোরা এলাকায়। তিনি বলেন, ‘ট্রাক ও ঘোড়া মুখোমুখি অবস্থানে আছে। তাদের দুই জনেরই ভালো ভোট আছে। তারা যেমন প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে, মাঠে তাদের নিয়ে আলোচনা সমালোচনাও বেশি। এ অবস্থায় জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা ও ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা জোটে থাকলে তাদের অবস্থান সবচেয়ে ভালো থাকতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘গলাচিপা শহরের বিএনপির সিনিয়র নেতারা নুরের সঙ্গে নাই।  নুরের উচিত ছিল ধানের শীর্ষ নিয়ে এখানে নির্বাচন করা, তাহলে শক্ত কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী থাকতো না। নুর কেন্দ্রীয় নেতা এবং অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সাধারণ মানুষ এ বিষয়টা বিবেচনা করে তাকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন।’

গলাচিপার চৌরাস্তা এলাকায় কথা হয় ৫০ বছর বয়সী একজন কৃষকের সঙ্গে। তার বাড়ি মুরাদনগর এলাকায়, তিনি সার কিনতে গলাচিপা শহরে এসেছেন। রাজনীতির বিষয় অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করছেন তিনি। ভোটের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই বলেন, ‘আগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি নৌকায় দিতাম’- এখন তো নৌকা নাই বলে একটু থামলেন। পরে বলেন, ‘নুরকেই ( ট্রাক) দেবো, নুর ঘাউড়া ছেলে, ওর দ্বারা গলাচিপার উন্নয়ন হবে। গলাচিপার নদীতে ব্রিজ পাস করাইছে, ও না হইতে পারলে ব্রিজ বাস্তবায়ন হবে না।’

ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী (হাতপাখা প্রতীক) মুফতি আবু বকর সিদ্দীক বলেন, ‘গলাচিপা-দশমিনায় জয়ের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী। এ আসনে সাংগঠনিকভাবে আমরা শক্ত অবস্থানে আছি। বিএনপির কোন্দলের কারণে তাদের কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে। দলের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে, এতে তাদের কিছু ভোট হাতপাখায় পাবো। এ ছাড়া এই আসনে অনেক হিন্দু ও আওয়ামী লীগের ভোটার রয়েছে, তাদের ভোট আমরা পাবো।’

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে বিভিন্ন সময় বা অনুষ্ঠানে আমরা হিন্দুদের পাশে থেকেছি। এতে তাদের সঙ্গে আমাদের একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগকে আমরা নির্যাতন করিনি।’

জামায়াতের প্রার্থী (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক) অধ্যাপক মু শাহ আলম বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোটারদের সাড়া পাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীকে মানুষ ভালোবেসে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন। সব ধর্মের মানুষ ও সব রাজনৈতিক দলের লোকেরা জামায়াতে ইসলামীকে মানুষ নিরাপদ মনে করেন। আমরা কোনও দলের মানুষকে নির্যাতন করিনি। আমি নির্বাচিত হতে পারলে চাঁদাবাজি বন্ধ করবো, হিন্দুদের সম্পদ মানসম্মান রক্ষায় কাজ করবো।’

বিএনপি জোটের প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর (ট্রাক প্রতীক) বলেন, ‘জয়ের বিষয়ে আমি শতভাগ আশাবাদী। গলাচিপা-দশমিনার সাধারণ মানুষ ট্রাকে ভোট দেবেন। আমরা এই জনপদের কোনও মানুষকে হয়রানি করিনি। মানুষ উন্নয়ন, শান্তি ও বেকার সমস্যার সমাধান চায়। আমি এসব সমস্যা সমাধানের জন্যই কাজ করছি। উপদেষ্টাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ব্রিজ পাস করাইছি। টেন্ডার হয়েছে, জানুয়ারিতে কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। টাকা ছাড় হয়ে গেছে, ১২ তারিখের পরেই এই ব্রিজের কাজ শুরু হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাই, যাতে ব্যবসায়ীরা নিরাপদে ব্যবসা করতে পারেন। দখল হওয়া খাস জমি ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে সঠিকভাবে বণ্টন করবো। চাঁদাবাজি ও দখলদারের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে কিছু মানুষ আমার বিরোধিতা করছে, সাধারণ মানুষ বিষয়টি বুঝেই আমার ট্রাক প্রতীকে ভোট দেবেন।’

হাসান মামুন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নুরুল হকের বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি আশাবাদী ঘোড়া প্রতীকের বিজয় হবে। গলাচিপা-দশমিনা উপজেলায় হিন্দু ও আওয়ামী লীগের ভোটার বেশি। শেখ হাসিনা ও তার নেতাকর্মীদের দেশছাড়া করেছেন নুরুল হক নুর, এতে আওয়ামী লীগের ভোট  আমাকে দেবেন। এদিকে দশমিনা-গলাচিপা উপজেলার বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও আমার পক্ষে কাজ করছেন।’ 

উল্লেখ্য, পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১২৪টি। মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৪০৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৪ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ২২৬ জন।