কবরে থেকে কীভাবে করবেন বিএনপির রাজনীতি?

বরিশাল কোতোয়ালি বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতে মৃত ব্যক্তি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের ছয় কর্মী এবং দুই প্রবাসী ব্যক্তিকে জায়গা দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন নেতাকর্মীরা। এই কমিটি বাতিলের দাবিতে ঝাড়ুমিছিল থেকে শুরু করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন কোতোয়ালি বিএনপির সাবেক নেতারা। 

অভিযোগ উঠেছে, আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে এ কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া কোতোয়ালি বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আমিন কেন্দ্রকে ম্যানেজ করে এ কমিটি গঠন করে নিয়ে এসেছেন বলে অভিযোগ আছে।

১৬১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব হলেন- সাইফুল ইসলাম আব্বাস। কমিটিতে একজন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, আট জন যুগ্ম আহ্বায়ক এবং বাকিদের সদস্য পদে রাখা হয়। তারা আহ্বায়ক নুরুল আমিনের অনুসারী। নুরুল আমিন হলেন বরিশাল-৫ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারের অনুসারী। এ কারণে কেন্দ্রীয় বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের যারা অনুসারী আছেন, তাদের কমিটিতে জায়গা হয়নি। 

কমিটির ১০৭ নম্বর সদস্য হলেন মৃত মিজানুর রহমান। তার মেয়ে ডালিম ও তন্বী জানিয়েছেন, তাদের বাবা সাড়ে তিন মাস আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। বেঁচে থাকাকালীন তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তবে বর্তমান কমিটিতে তার নাম কীভাবে এসেছে, তা তারা জানেন না। আর মৃত মানুষ কবরে থেকে কীভাবে রাজনীতি করবেন। বিএনপির নেতৃবৃন্দ মৃত্যুর খবর জানতেন না বলেই কমিটিতে নাম এসেছে বলে জানান তারা।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজনকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পাঁচ আওয়ামী লীগের কর্মীকে সদস্য করা হয়েছে। তারা হলেন যুগ্ম আহ্বায়ক ওবায়দুল করিম তুহিন এবং ২২ নম্বর সদস্য সিরাজুল হক মাস্টার, ৬১ নম্বর সদস্য হুমায়ুন কবির বাদল ঢালি, ৮৮ নম্বর সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন, ১০২ নম্বর সদস্য সাহাবুদ্দিন স্বপন, ১৩৪ নম্বর সদস্য ক্যাপ্টেন (অব.) আলাউদ্দিন। তারা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। যার প্রমাণ মিলেছে আওয়ামী লীগের সভা-সমাবেশ এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেতাদের সঙ্গে তাদের ছবি দেখে। যা কোতোয়ালি বিএনপির সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন।

প্রবাসে অবস্থান করেও বিএনপির কমিটিতে জায়গা করে নেওয়া ব্যক্তিরা হলেন কমিটির ৬০ নম্বর সদস্য মিরাজ ব্যাপারী ও ৯৮ নম্বর সদস্য গিয়াস উদ্দিন ফকির। এ ছাড়া কমিটির ১৮ নম্বর সদস্য করা হয়েছে প্রায় আট বছর ধরে শয্যাশায়ী ফরিদ উদ্দিনকে।

কমিটি বাতিলের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন কোতোয়ালি বিএনপির সাবেক নেতারা

এ ব্যাপারে বর্তমান কমিটির ২ নম্বর সদস্য ইসরাইল পণ্ডিত, ৩ নম্বর সদস্য জিয়াউল ইসলাম সাবু, ৪ নম্বর সদস্য ও সাবেক কোতোয়ালি বিএনপির সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম সেলিম, ৫ নম্বর সদস্য মন্টু খান জানিয়েছেন, গত ১২ জুলাই বরিশাল কোতোয়ালি বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই নানা ধরনের অভিযোগ আসতে শুরু করে। বিশেষ করে মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কমিটিতে রাখা হয়েছে। এই কমিটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।

জিয়াউল ইসলাম সাবু বলেন, ‌‌‘এই কমিটিতে স্থান পেয়েছেন একজন মৃত ব্যক্তি। আমাদের প্রশ্ন সেই মৃত ব্যক্তি কীভাবে কবরে থেকে বিএনপির রাজনীতি করবেন। এখানে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানকারী দুই ব্যক্তিকেও সদস্য পদ দেওয়া হয়েছে। তারা বিদেশে থেকে কীভাবে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতি করবেন, তা আমাদের জানা নেই। এখানে আহ্বায়ক নুরুল আমিন মোট অংকের চাঁদাবাজি করেছেন। সেই চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিতর্কিত লোকজন স্থান করে নিয়েছেন কমিটিতে।’ 

এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন পদবঞ্চিত ও সাবেক নেতারা। তারা বলছেন, আমরা কোনোভাবেই এই কমিটি মানি না। কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি দেওয়ার জন্য ঝাড়ুমিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। আমরা নতুন ঘোষিত আহ্বায়ক কমিটির বিতর্কিত বিভিন্ন দিক কেন্দ্রের কাছে লিখিতভাবে তুলে ধরেছি। একই সঙ্গে প্রমাণও দিয়েছি। আশা করছি কেন্দ্র কমিটি বিলুপ্ত করে নতুনভাবে কমিটি করবেন।

কমিটির বিষয়ে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোতোয়ালি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে জানতে পেরেছি আওয়ামী লীগের কর্মী, মৃত ব্যক্তি এবং প্রবাসীদের নিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি গঠনের বিষয়ে কেন্দ্র থেকে আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করা হয়নি। যোগাযোগ করা হলে এ ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হতো না।’

এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাংগঠনিক কার্যক্রম সাংগঠনিকভাবেই হওয়া উচিত। কোতোয়ালি বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এর ব্যতয় ঘটেছে। এমনকি এই কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ জেলা বিএনপিকেও অবহিত করা হয়নি। যে কারণে কমিটি নিয়ে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।’

এ বিষয়ে বরিশাল কোতোয়ালি বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আমিন তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পাশ কাটিয়ে বলেন, ‘কমিটি দিয়েছে কেন্দ্র। এখানে আমার কোনও হাত ছিল না। হাইকমান্ডের কমিটি যারা মানে না, যারা অরাজকতা সৃষ্টি করছে তাদের বিচার চাই আমি। যাতে করে হাইকমান্ড থেকে কমিটি দিলে কেউ আর এ ধরনের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে কমিটিকে বিতর্কিত করতে না পারে।’