প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোর রাতে টেকনাফের নয়াপাড়া নিবন্ধিত শরণার্থী শিবিরের পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে ‘সি’ ও ‘ডি’ ব্লক সংলগ্ন (শালবাগান) আনসার ক্যাম্পের সামনে দিয়ে মাথায় ক্যাপ পরা তিন লোক হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় কর্তব্যরত আনসার সদস্য অজয় বড়ুয়া তাদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকেন। হঠাৎ মুখোশধারীরা পেছন থেকে তার চোখ ও হাত বেঁধে ফেলে। পরে ১৫/২০ জনের ডাকাত দল ব্যারাকের ভেতরে ঢুকে আলো বন্ধ করে ৮ আনসার সদস্যকে রশি দিয়ে বেঁধে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে। ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা আনসার কমান্ডার মো. আলী হোসেন পাশের রুম থেকে এগিয়ে তারও হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। এ সময় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করে। পরে তালা ভেঙে অস্ত্রাগারে থাকা ১১টি অস্ত্র ও ৬৭০টি কার্তুজ লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা। যাওয়ার সময় তারা গুলি ছোড়ে।
জানা গেছে, অস্ত্রাগার লুট ও আনসার সদস্যকে গুলি করে যাওয়ার পথেও এক ব্যক্তিকে দা দিয়ে কুপিয়ে নর্দমায় ফেলে যায় তারা। আহত আবদুল আমিন ওই এলাকার আমির হামজার ছেলে।
ঘটনার খবর পেয়ে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদ, ক্যাম্প ইনচার্জ মো. শহিদুল ইসলাম ও ক্যাম্পের পুলিশের ইনচার্জ মো. কাসেমের নেতৃত্বে পুলিশের দুটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আনসার সদস্যদের উদ্ধার করে স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র নেন। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার গুলিবিদ্ধ আলী হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
শুক্রবার সকালে আবদুল আমিনের পরিবার খবর পেয়ে তাকে টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কক্সবাজারে পাঠান।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মো. এনামুল হক জানান, আহত আবদুল আমিনের মাথায় পেছনে ৪/৫ টি দায়ের কোপ রয়েছে।
জানতে চাইলে ক্যাম্পের পুলিশের ইনচার্জ মো. কাসেম জানান, রাতে একদল ডাকাত দল আনসার ব্যারাকে ঢুকে গুলি করে এবং অস্ত্র ও গুলি লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনা এক আনসার সদস্য নিহত হয়েছেন।
তিনি আরও জানান, এই ক্যাম্পে ১৯ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে। কিন্তু এখানে পুলিশ আছে মাত্র ১৫ জন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিছু ডাকাতের নাম বের হয়ে এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, ওই শালবাগান ক্যাম্পে নিহত কমান্ডার মো. আলী হোসেন, অজিত বড়ুয়া, শ্রী চয়ন কুমার শীর, মো. হোসাইন, আবদুর রাজ্জাক, মো. শহিদ, ইব্রাহীম খলিল, মো. আমজাদ ও নায়েক রফিক ছিলেন।
শালবাগান ক্যাম্পের আনসার ব্যারাকের সদস্য ইব্রাহীম খলিল জানান, শুক্রবার ভোর রাতে দায়িত্ব শেষ করে বাথ রুমে যান তিনি। এমন সময় বাইরে থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখেন ১৫/২০ জন মুখোশধারী ডাকাত ব্যারাকে ঢুকে আনসার সদস্যদের রশি দিয়ে বেঁধে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রেখেছে। বিষয়টি তিনি মোবাইল ফোনে ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের জানান। পরে তিনি গুলির আওয়াজ পান। ডাকাতরা ১৫ মিনিটের মধ্যে অস্ত্র ও গুলাবারুদ লুট করে পালিয়ে যায়।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত কয়েকদিন ধরে নয়াপাড়া মুচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আনসার শালবাগান ব্যারাকের পাশে অবস্থিত ‘গুহান’ পাহাড়ে সংঘবদ্ধ ডাকাত দলকে আনাগোনা করতে দেখা গেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সড়কে, নাফ নদীতে, সাগর ও মিয়ানমারে গিয়ে ডাকাতি, খুন-খারাবিসহ বিভিন্ন অপারাধ করে বেড়াচ্ছে। মিয়ানমারের বিছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে সর্ম্পক রয়েছে তাদের।
জানা গেছে, সন্দেহভাজন ডাকাতরা হলেন- চট্টগ্রামে অবস্থানকারী রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) নেতা আবদুর রাজ্জাক ও ডি ব্লকের শীর্ষ ডাকাত রফিক, টেকনাফের শীর্ষ ডাকাত আবদুল হাকিম ডাকাত, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের মোস্তাক, হারুন, নুর আলম, নেজাম, জকির আহমদ, রশিদ উল্লাহ, হাসান, মো. আয়াছ, হোসেন আহমদ, কেফায়েত উল্লাহ, মাস্টার রশিদ, ডা. ইউনুছ, খোরশেদ ও মাহামুদুল হাসান ও কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের খাইরুল আমিন।
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডার তানভীর আহমদ, জেলা প্রশাসক আলী হোসেন, কক্সবাজার পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ, ২৯ আনসার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অফিসার তানজিনা বিনতে এরশাদ, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শফিউল আলম।
কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ সাংবাদিকদের জানান, ক্যাম্পের পাশের পাহাড়ে ডাকাত দলের আস্তানা আছে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পেরেছি। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার বাহিনী যৌথভাবে ওই পাহাড়ে অভিযান চালাচ্ছে।