ডিজিটালাইজেশনে ভূমি অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রত্যয় ওলিউজ্জামানের

সারাদেশে ভূমি অফিসগুলো যখন অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, তখন অনলাইন সেবা আর ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে তা প্রতিকারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসিল্যান্ড ওলিউজ্জামান। যোগদানের এক বছরের মধ্যেই অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, অনলাইনে ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র সংরক্ষণ এবং অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে অফিসে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন এই সহকারী কমিশনার। এর ফলে দালালমুক্ত হচ্ছে ভূমি অফিস। হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে শুরু করেছেন সাধারণ গ্রাহকরা।এসিল্যান্ড ওলিউজ্জামান

ভূমি অফিস থেকে জানা যায়, ওলিউজ্জামান সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে হাজীগঞ্জে যোগ দেন গত বছরের ১৮ মে। মূলত সে থেকেই উপজেলা ভূমি অফিসের অনেক পরিবর্তন শুরু হয়। মাত্র ১৪ মাসের মধ্যেই এ অফিসটি একটি ডিজিটাল অফিসে রূপান্তর হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাজ, সেবাসহ যা যা প্রয়োজন তার সবই হচ্ছে এই অফিসে। ইতোমধ্যে এই অফিসের সব নথির খাতা শালু কাপড়ে বাঁধাই করা হয়েছে যা আগে ছেঁড়া নথি হিসেবে ভাবা হতো। নথি সংরক্ষণের জন্যে মূল ভবনের ছাদে একটি নতুন রেকর্ড রুম তৈরি করা হয়েছে। এই রুমে পুরনো সব নথি সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

এছাড়া অফিসের সব নথি অনলাইনে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে কেউ ইচ্ছে করলে উপজেলা ভূমি অফিসের পোর্টালে ঢুকে তার নিজের নামজারি নথি দেখতে ও প্রিন্ট নিতে পারবেন। এমনকি ওইসব নথিতে ভুল থাকলে ওই পোর্টাল থেকে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে সংশোধন করে নিতে পারবেন। নাম জারির পুরো সিস্টেমটাই ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে।

এদিকে নামজারিতে কোনও দালাল শ্রেণির কিংবা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের লোকজন যেন বেশি টাকা নিতে বা চাইতে না পারেন সেজন্যে ইতোমধ্যে সকল ভূমি অফিসে সিটিজেন চার্টার এবং জনসচেতনতামূলক ফেস্টুন টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার ভূমি অফিসের কেউ অতিরিক্ত টাকা নিলে তার বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে হচ্ছে।

উপজেলা ভূমি অফিসে অটোমেশন সিস্টেম চালু করা হয়েছে। হোল্ডিং নাম্বারসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার সকল বাড়িঘরের ঠিকানা রয়েছে ভূমি অফিসের পোর্টালে। যে কেউ তার নিজের হোল্ডিং এখানে মিলিয়ে নিতে পারেন বা কারও হোল্ডিং মিসিং হলে তা উক্ত অফিসে তথ্য দিয়ে সংশোধন করে নিতে পারেন যার পুরো বিষয়টি পাইলট প্রকল্প হিসেবে নেওয়া হয়েছে।chandpur-pic-2

সরেজমিনে ওই অফিসে গিয়ে দেখা যায়, গত এক থেকে দেড় বছর আগের সেই ভবনটি এখন আর আগের মতো নেই। মূল ভবনের আমূল পরিবর্তনসহ পাশে সুবিধাভোগীদের বসার জন্যে আলাদা ভবন করা হয়েছে। এই ভবনের হেল্প ডেস্ক থেকে গ্রাহকের কাঙ্ক্ষিত সেবার বিষয়টি টোকেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট টেবিলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

অফিসে ঢুকতেই উভয় পাশে সাধারণ গ্রাহকদের সুবিধার জন্যে কী কী কাজ করা হয় এ সংক্রান্ত সিটিজেন সার্টার বোর্ড টানানো রয়েছে।

মূল ভবনে ঢুকতেই সামনের দেয়ালে রয়েছে বায়োমেট্টিক পদ্ধতিতে উপস্থিতি যন্ত্র। যাতে আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যথাসময়ে অফিসে প্রবেশ ও বাহির বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সেবা নিতে আসা কয়েকজন গ্রাহক বলেন, এর আগেও জমি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে এ অফিসে এসেছি। তবে সরাসরি আসতে পারিনি। তাছাড়া সেবা পেতে মোটা অঙ্কের টাকা গুণতে হয়েছে। টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয়েছে। কিন্তু এখন সিস্টেম অনেকটাই সহজ মনে হচ্ছে। ঘুষ দেওয়ার ভয় এখন অনেকটাই নেই। ওলিউজ্জামান এ অফিসে আসার পর টোটাল পরিবেশটাই বদলে গেছে।

হাজীগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওলিউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দালালমুক্ত সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছি। অফিসের প্রত্যেক কর্মকর্তার রুমের সামনে নেমপ্লেট দিয়েছি, যাতে করে গ্রাহকরা সহজেই কর্মকর্তাদের খুঁজে পান। রেকর্ড রুম ছিল না, ইতোমধ্যেই রেকর্ড রুম তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া আরও কিছু কাজ হাতে নিয়েছি- এরমধ্যে সেবা নিতে আসা গ্রাহকের বসার জন্য ব্যবস্থা তৈরি করছি।chandpur-pic-3

ওলিউজ্জামান আরও বলেন, আমি এখানে আসার পর প্রথমেই নামজারি ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেই। অফিসকে দালালমুক্ত করতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি সময়মতো নিশ্চিত করার জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে উপস্থিতির ব্যবস্থা করি।এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে অনলাইনে কাজ শুরু করতে ভূমি অফিসগুলোকে বাধ্য করেছি। কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছি। এমনও নজির আছে প্রতারিত গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করেছি। তাছাড়া কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোনও অনিয়ম-দুর্নীতি করা যাবে না। মোট কথা, কোন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকবে না এ উপজেলায়।

অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে এ উপজেলায় ইতোমধ্যেই যারা ৫ বছর ধরে আছেন তাদেরকে বদলি করেছে জেলা প্রশাসন। আর যারা ৩ বছর পর্যন্ত কাজ করছেন তাদেরকেও বদলি করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান ওলিউজ্জামান।

তিনি বলেন, আগে সাধারণ গ্রাহকরা অফিসে আসতে চাইতো না, এখন গ্রাহকরা সরাসরি উপজেলা ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসছেন।

তিনি আরও  বলেন, এ অটোমেশন সিস্টেমের মাধ্যমে আমরা গ্রাহকের আবেদন অনলাইনে এন্ট্রি করি এবং অনলাইনে প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহককে আমরা খতিয়ানসহ নামজারি সেবা দিচ্ছি। তাছাড়া অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে তাদের নথির কার্যক্রম সম্পর্কে এসএমএস মাধ্যমে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানানো হবে।

আরও পড়ুন: সিরাজদিখানে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ 

/এআর/