জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমাদের মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কমিটি ৭ থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত ফেনীর বিভিন্ন এলাকায় প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান করেছে। এ সময় তদন্তদলের কাছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক ও সামজিক সংগঠনের প্রবীণ নেতারা এবং মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সাক্ষ্য দেন। তারা প্রায় সবাই মুকবুলকে ১৯৭১ সালে ফেনীতে বেশির ভাগ মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনাকারী ও নিদের্শদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করেন ।
সাক্ষ্যদাতারা মুক্তিযুদ্ধের সময় মকবুলের তৎপরতাও বর্ণনা করেছেন। তাদেরই একজন দাগনভুঞা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শরিয়তউল্যাহ বাঙ্গালী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মকবুলের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন।
শরিয়তউল্যাহ বলেন, ‘৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ফেনী হানাদারমুক্ত হয়। ওই দিন দুই নম্বর সাব সেক্টর কমান্ডার জাফর ইমামমের নেতৃত্বে আমরা বিজয়ী বেশে ফেনীতে প্রবেশ করি। নিজ এলাকা দাগনভুঞায় গিয়ে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী ও তাদের এই দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিত্র দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়ি । ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে এসে অভিযোগ করে, ১৯৭১ সালের ১১ জুন তৎকালীন ফেনীর শান্তি বাহিনীর প্রধান মকবুলের নির্দেশে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারা তাদের ঘরবাড়িতে হামলা চালায়। তারা বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়, একজনকে গুলি হত্যা করে। আরও ১০ জনকে হাত-পা বেঁধে ট্রাকে তুলে নিয়ে শহরের সিও অফিস এলাকায় মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করে।’
তিনি জানান, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তদলের প্রধান নুরুল ইসলামের কাছেও এসব তথ্যসহ দাগনভুঞা লালাপুর হিন্দু পাড়ায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে আরও তথ্য দিয়েছেন। ’
তিনি জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় দাগনভুঞা ইউনিয়নের খুশিপুরের মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্যাহ গোপনে তার ৭ মাসের শিশু সন্তানকে দেখতে আসেন। যেদিন তিনি বাড়ি আসেন, সেদিন রাত ১২টার দিকে তাকে মকবুলের সহযোগী মোশাররফ হোসেন মশা রাজাকার ধরে নিয়ে যায়। তাকে স্থানীয় সিলোনীয়া বাজারে রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন ও গুলি চালিয়ে হত্যা করে তার লাশ নদীতে ফেলে দেয়। পরে তার লাশ স্বজনেরা আর খুঁজে পায়নি। মশা রাজাকারের বাড়ি মকবুলের গ্রামের বাড়ি সাফুয়া এলাকার ওমরাবাদ গ্রামের পাশেই ।’
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শরিয়তউল্যাহ বাঙ্গালী আরও বলেন, ‘এই রকম আরও অনেক নির্মম ঘটনা আছে যেগুলো রাজাকার ও আলবদররা ঘটিয়েছে। আর্তাতুক হাইস্কুলে রাজাকার কমান্ডার ছিল চৌধুরী রাজাকারের চাচাতো ভাই আজিজ উল্যাহ। ফাজিলের ঘাটের মুক্তিযোদ্ধা বারেককে হত্যা করে সে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাওলা সাহেবের ভাতিজা মফিজকেও হত্যা করে। মোমারিজপুরের সিদ্দিক উল্যাহ ও কাশেম নামে দুই মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধা মাওলার বাড়িতে, এয়ারপুর গিয়াস উদ্দিন মাস্টারের বাড়িতে, আজিজপুর মুক্তার বাড়িতে, পরিমল মাস্টারের বাড়িতে আগুন দেয় তারা। পরিমল মাস্টারের বাড়িতে তিন নারীকে গুলি করে হত্যা করে এই রাজাকারেরা।’
ক্ষোভের সঙ্গে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, রাজাপুর ক্যাম্পের রাজাকার কমান্ডার সিরাজের নেতৃত্বে রাজাকাররা সেখানে বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেয় ও সেই এলাকার বোলা বাড়ির একজনকে গুলি করে হত্যা করে। এভাবে বহু নির্যাতনের চিত্র আছে যার ক্ষতচিহ্ন দাগনভুঞা উপজেলায় ৪৭ বছর ধরে জীবন্ত।
শরিয়তউল্যাহ বাঙ্গালী বলেন, ‘এসব নাশকতার নেতৃত্ব দিয়েছেন বর্তমান জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমির মকবুল আহমাদ। তার নেতৃত্বে ফেনী ও দাগনভুঞা অঞ্চলে রাজাকার ক্যাম্প স্থাপিত হয়। রাজাকার বানানো হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হয়। নিরীহ মানুষের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। তবে দেরিতে হলেও সরকার এই ঘটনার বিচার শুরু করেছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের কাছে এই ব্যাপারে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছি। তথ্য দিয়ে বলেছি, এসব ঘটনার আমরা বিচার চাই। আমরা এতে আশাবাদী। আমরা বেঁচে থাকতে এই বিচার দেখে যেতে চাই।’
/এফএস/এসটি/এপিএইচ/
আরও পড়ুন: ‘মকবুলের নির্দেশেই সেদিন হত্যাকাণ্ড চালায় রাজাকাররা’