একদিন আগেই ঈদ করে বাড়ি ছাড়ে জঙ্গি আশরাফুল, নিখোঁজ তার বোনও

জঙ্গি আশরাফুল আলম ওরফে নাজিমসিলেটের শিববাড়ির আতিয়া মহলের অদূরে পাঠানপাড়ায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটনার মূল হোতা এবং মৌলভীবাজারের বড়হাটে নিহত জঙ্গি আশরাফুল আলম ওরফে নাজিম নিজের এলাকায় যায়নি প্রায় আট-নয় মাস। গত রোজার ঈদের একদিন আগেই ঈদ উদযাপন করে বাড়ি ছেড়ে যায়। এরপর আর ফিরে আসেনি সে। সপ্তাহখানেক আগে ফোন করে কেবল মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিল। আশরাফুলের এক বোনও গত দুমাস ধরে নিখোঁজ। তিনি একটি মাদ্রাসায় চাকরি করতেন। নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি ইউনিয়নের কুমারঘরিয়া গ্রামে আশরাফুলের বাড়ির আশপাশের লোকদের সঙ্গে কথা এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে মঙ্গলবার (৪ এপ্রিল) সকালে আশরাফুলের মা মনোয়ারা বেগম মৌলভীবাজারে ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। তবে দাফনের জন্য লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, মনোয়ারা বেগম তাদের বলেছেন, রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত এমন ছেলের লাশ নিয়ে তিনি কলঙ্কের ভাগ নিতে চান না। তিনি মঙ্গলবারই নোয়াখালীর পথে রওনা হয়েছেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি ইউনিয়নের কুমারঘরিয়া গ্রামে পালোয়ান বাড়ির সুলতান আহাম্মদের সাত সন্তানের মধ্যে সবার ছোট আশরাফুল। তারা পাঁচ বোন ও দুই ভাই। সুলতান আহাম্মদ প্রায় ১২ বছর আগে মারা যান।
দেওটি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতাহের হোসেন জানান, ‘আশরাফুল ঢাকায় থাকতো। তবে পড়ালেখা করতো সোনাইমুড়ী উপজেলার কড়িহাটি ছালেহ্ মিয়া ফাজিল মাদ্রাসায়। ওই মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাশ করেছে আশরাফুল। ঢাকায় থাকলেও শুধু পরীক্ষার সময় বাড়িতে এসে পরীক্ষা দিয়ে যেতো । পরে সে ঢাকায় তার নানার কাছে যায় এবং একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হয় ও কোরআনে হাফেজ হয়। এ সময় তার মায়ের সঙ্গে মাঝে মাঝে মোবাইলে যোগাযোগ হতো। কিন্তু গত ৮/৯ মাস থেকে তার সঙ্গে পরিবারের কোনও যোগাযোগ ছিল না। সর্বশেষ ১৫-২০ দিন আগে হঠাৎ করে মাকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছিল।’
তিনি আরও জানান, ‘আশরাফুলের এক বোন নাজমা বেগম (২৪) ঢাকার এক মাদ্রাসায় চাকরি করতো। পরে গত দুই বছর আগে ফেনীর এক ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের তিন দিনের মাথায় তার তালাক হয়ে যায়। সে আবার ঢাকায় ওই মাদ্রাসায় চাকরি নেয়। সে-ও প্রায় দুই মাস যাবত নিখোঁজ রয়েছে।

আশরাফুলদের প্রতিবেশী ছমির খান জানান, ‘বাড়িতে আশরাফুলের মা মনোয়ারা বেগম ছাড়া আর কেউ থাকেন না।’ তিনি বলেন, ‘নাজিম ভদ্রভাবে চলতো। সে সবাইকে সালাম দিতো। নিয়মিত নামাজ কালাম পড়তো। গত বছর হঠাৎ করে ঈদুল ফিতরের নির্দিষ্ট দিনের একদিন আগে ঈদ উদযাপন করে। এর আগে আমাদের সঙ্গেই ঈদ উদযাপন করতো ও নামাজ পড়তো। ঈদ উদযাপনের পর থেকে তাকে আর এলাকায় দেখা যায়নি।’
পুলিশের দাবি, আতিয়া মহলের জঙ্গি আস্তানায় সেনাবাহিনীর অভিযান চলাকালে কাছেই পাঠানপাড়ায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বড়হাটের আস্তানায় চলে আসে আশরাফুল। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় সে আত্মঘাতী হয়। তার পরিচয় শনাক্ত করতে মা মনোয়ারা বেগমকে ডেকে পাঠায় পুলিশ। মনোয়ারা বেগমের সঙ্গে মৌলভীবাজার গিয়েছিলেন দেওটি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতাহের হোসেনও। তিনি বলেন, ‘‘মরদেহ শনাক্ত করার পর পুলিশ কর্মকর্তারা তার মাকে মরদেহ নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু তিনি এক কথায় বলেছেন- ‘ওই ছেলের লাশ আমি নেবো না।’ তিনি (আশরাফের মা) বলেন, ‘যে ছেলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করে, ধর্মের নামে মানুষ মারে তাকে আমার বাড়িতে আমি কেন নেব?’ পরে দুপুরের দিকে কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে মৌলভীবাজার থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশে রওয়ানা হই আমরা।’’
বড়হাটে নিহত আশরাফুল আলম নাজিমের বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার কুমারগোরিয়া গ্রামে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন সোনাইমুড়ী থানার উপ-পরিদর্শক বাবর আলীও। তিনি জানান, ‘আশরাফুলের মায়ের সঙ্গে সোমবার রাতে তিনিও সিলেট গিয়েছেন। সেখানে মরদেহ ও ছবি দেখালে তার মা মনোয়ারা বেগম আশরাফুল তার ছেলে বলে শনাক্ত করেন। তবে তিনি ছেলের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনতে রাজি হননি। দেশদ্রোহী ছেলে তার হতে পারে না বলে পুলিশের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের সামনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন। ’
/এফএস/ এপিএইচ/আপ-এআর/