রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে মাটিচাপায় সুফিয়া বেগমের বড় ছেলে, পুত্রবধূ ও বড় ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। এখনও তাদের লাশ উদ্ধার হয়নি। বর্তমানে দুই মেয়ে, চার ছেলে ও দুই নাতি নিয়ে রাঙামাটি সরকারি কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন সুফিয়া।
সেই দুর্বিষহ স্মৃতি মনে করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুফিয়া বেগম বলেন, ‘সাজানো গোছানো সংসার মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেলো মাটিচাপায়। ছেলেমেয়ে আর নাতি-নাতনি নিয়ে মোটামুটি সুখেই ছিলাম। ঘটনার প্রায় ১২ মিনিট আগে আমরা সবাই পাশের বাড়িতে আশ্রই নিই। পাহাড় ধসের খবর শুনে আমার ভাই সাহায্য করতে আসেন। তখন সে, ছেলে আর ছেলের বউ বাসার কিছু জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে বের হচ্ছিল। এমন সময় ওপর থেকে নামা পাহাড়ের মাটিতে চাপা পড়ে সবাই। চোখের সামনেই তাদের হারালাম। তখন কিছুই করার ছিল না আমার।’
সুফিয়া বেগমের ছোট মেয়ে রিনা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মামা সকালে আমাদের বাড়ির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শুনে আমাদের সাহায্য করতে এসে তিনিও মাটিচাপায় মারা যান। আমার বড় ভাইয়ের দুটি ছোট ছোট বাচ্চা। বড়টার নাম মিম, ওর বয়স ৬ বছর। আর ছোট মেয়ে সুমাইয়ার বয়স ১৭ মাস। মিম মাঝে মধ্যে ‘মা, মা’ বলে কাঁদে। ওদের নিয়ে আমরা কোথায় যাবো, কি করবো, ওদের ভবিষ্যত কি হবে কিছুই জানি না। ঘরে ফিরে যাওয়ার মতো কোনও অবস্থা নাই।’
রিনা আরও বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রে দুপুরে খিচুড়ি আর রাতে সাদা ভাত দেয়। কিন্তু সকালে আমাদের জন্য কোনও নাস্তা থাকে না। ২ থেকে ১০ বছরের বাচ্চাদের একটা করে কলা ও এক টুকরো পাউরুটি দেয়। আমরা না খেয়ে থাকি সকালে। সকালে যে কিছু কিনে খাবো সেই টাকা নাই আমাদের।’
আশ্রয়কেন্দ্রে আসা লোকজনের অভিযোগ, এখানে আসা চিকিৎসকদের কাছে সব ওষুধ থাকে না। সেগুলো বাইরে থেকে কিনে আনার জন্য বলেন চিকিৎসকরা। আশ্রয় নেওয়া অনেকে বললেন, ‘ওষুধ কিনে খাওয়া আমাদের পক্ষে এখন খুব কঠিন। তাও না পেরে সুমাইয়াকে চার দিন হাসপাতালে রেখে এখন কিছুটা ভালো। তাই এখানে নিয়ে এসেছি। এভাবে যদি আরও কিছুদিন আমাদের এখানে থাকতে হয় তাহলে আমরা সবাই অসুস্থ হয়ে যাবো। ব্র্যাক থেকে মশারি দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা টয়লেটের অবস্থা খুব খারাপ। অনেক সময় এখানে পানিও থাকে না। আবার কয়েকটাতে ছিটকিনিও নাই। আর গোসলের জন্য অনেকদূরে নদীতে যেতে হয়। সরকার আমাদের নিরাপদ জায়গায় বাড়ি করে দিক। সেখানে যেন রাতে নিরাপদে ঘুমাতে পারি। আমরা আর এখানে থাকতে চাই না। বাড়ি ফিরতে চাই।’
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য একটি টেকসই পুনর্বাসন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এগোতে হবে। এই জায়গাগুলোতে জরিপ ও পরিদর্শন করে একটি টেকসই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার কথা ভাবছি। ভবিষ্যতে আর পাহাড় ধসের ঘটনায় কোনও মৃতদেহ দেখতে চাই না। আগামী ১৬ জুলাই জেলা প্রশাসন থেকে একটি কমিটি গঠন করা হবে। এর কাজ হলো প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা। এরপর আমরা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবো।’
গত ১৩ জুন প্রবল বর্ষণের কারণে রাঙামাটিতে ঘটে যায় স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধস। এ ঘটনার এক মাস অতিবাহিত হলো বৃহস্পতিবার।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পাহাড় ধসে ১২০ জন প্রাণ হারিয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ হাজার ৫০০ পরিবার। সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ১ হাজার ২৩১টি বাড়ি, আংশিক বিধ্বস্ত বাড়ির সংখ্যা ৯ হাজার ৫০০। বাকিগুলো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ধসের শিকার পরিবারগুলোর বেশির ভাগই এখনও আশ্রয়কেন্দ্রে আছে। এগুলোতে খাবারের জোগান দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
/জেএইচ/