নবীনগরে উদ্ধার কঙ্কাল ঢাকা মেট্রোপলিটন ক্রিয়েটিভ স্কুলের ছাত্র মাহিদের

মাহিদ আহম্মেদচার মাস আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে উদ্ধার হওয়া একটি কঙ্কালের পরিচয় মিলেছে। কঙ্কালটি ঢাকা মেট্রোপলিটন ক্রিয়েটিভ স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র মাহিদ আহম্মেদের (১৮)। সে ঢাকার মধ্য বাড্ডার ব্যবসায়ী কবির আহাম্মেদের ছেলে।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে মাহিদ নিখোঁজ ছিল। ২২ নভেম্বর অজ্ঞাত কঙ্কালটি পায় পুলিশ।

পুলিশ বলছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল আসামি মেহেদী হাসান ১৮ মার্চ (রবিবার) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা সিদ্দিকের আদালতে হত্যাকাণ্ডের জবানবন্দি দিয়েছে। তার জবানবন্দি থেকে কঙ্কালের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

মেহেদী হাসান আদালতকে জানিয়েছে, মাহিদের মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য সে এবং তার বন্ধু অছিম মাহিদকে হত্যার জন্য দুই দিন আগে থেকে পরিকল্পনা করে। ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাত সাড়ে ৭টার দিকে নবীনগরে সোহাতা গ্রামের কানাবাড়ী এলাকার হোসেন মিয়ার বাড়ির পুকুরের পাড়ে বসে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে মাহিদ আহম্মেদকে অচেতন করা হয়। একপর্যায়ে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে গলায় আঘাত করে তাকে হত্যা করে ধানক্ষেতে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে অছিম মোটরসাইকেলযোগে মেহেদীকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়।  

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অসিম চন্দ্রধর জানান, ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর অজ্ঞাত কঙ্কালটি পায় পুলিশ। লাশ ধানক্ষেতের কাদাপানিতে ডুবে থেকে একেবারে পচে গলে কঙ্কাল বের হয়ে যায়।  ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর পৌর এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সোহাতা কানাবাড়ী মোড়ের একটি জমি থেকে সেটি উদ্ধার করা হয়। পরে তদন্ত শেষে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২২ নভেম্বর পুলিশ নবীনগর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে।

এদিকে মাহিদ আহাম্মেদের মা রাহিমা সুলতানার করা জিডির পর ঘটনার মোড় ঘুরতে থাকে। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বাড্ডা থানায় তিনি জিডি করেন। জিডিতে বলা হয়, ১০ নভেম্বর বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে তার ছেলে মাহিদ আহাম্মেদ মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়। রাতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মাহিদ তার মাকে জানায়—বন্ধু মেহেদী হাসানের সঙ্গে সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর বেড়াতে যাচ্ছে। ১৫ নভেম্বর সে বাড়িতে ফিরবে। ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় তার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। মেহেদী হাসানের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ফোন করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

গ্রেফতার মেহেদী হাসাননবীনগর থানা পুলিশ জানিয়েছে, ২২ নভেম্বর গণমাধ্যমে নবীনগর পৌর এলাকার সোহাতা গ্রামের কানাবাড়ী ধানক্ষেত থেকে কঙ্কাল উদ্ধারের খবর প্রকাশ হয়। রাহিমা সুলতানা তার ছেলের লাশ হতে পারে ভেবে নবীনগর থানায় যোগাযোগ করেন। তখন ডিএনএ টেস্টের জন্য তাকে আবেদন করতে বলা হয়। ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ডিএনএ টেস্টের জন্য তিনি নবীনগর থানায় আবেদন করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ডিএনএ টেস্ট করা হয়।

ডিএনএ টেস্টের প্রতিবেদন আসার আগেই নবীনগর থানা পুলিশ মাহিদের মোবাইল ফোনের কললিস্ট দেখে বাড্ডা থানা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে তদন্তে নামে। কললিস্ট পর্যালোচনায় মেহেদি হাসানের সঙ্গে মাহিদের কথোপকথনের তথ্য পাওয়া যায়। কললিস্ট ধরে পুলিশ জানতে পারে, সন্দেহভাজন লোকটির বাড়ি নবীনগর উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে। সে ওই গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে। 

১৮ মার্চ মামলাটি তদন্তের জন্য নবীনগর থানার এসআই অসিম চন্দ্রধর এবং বাড্ডা থানার এএসআই আব্দুল কাদের নবীনগর উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে আসে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর মেহেদী হাসানও ওইদিন বাড়িতে ফেরে। একপর্যায়ে মেহেদী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করে। তখন মেহেদী হাসানকে ধাওয়া করে ধরা হয়। পরে সে পুলিশের কাছে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে।

নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম শিকদার ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অসিম চন্দ্রধর জানান, ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর দায়ের করা অপমৃত্যু মামলাটি ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মেহেদী হাসানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাহিদের মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করা হয়েছে। পলাতক আসামি অছিমকে গ্রেফতারেও অভিযান চলছে।