বুধবার বিকালে ফেনীর ধর্মপুর আবাসন ও আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে ৩ নম্বর ব্যারাকের ১১ নম্বর কক্ষে দেখা মিলে ৮৮ বছর বয়সী মেহেরজান বিবির। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘চরম অসহায়ত্বের মাঝে তার দিন কাটছে। দুই মুঠো ভিক্ষার জন্য স্ট্রেচারে ভর দিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান। মানুষের দেওয়া ভিক্ষায় তার জীবিকা চলে। অভাব আর রোগ-শোকের মধ্যে দিনাতিপাত করলেও কেউ খবর নেয় না।’
মেহেরজান বিবি জানান, তার স্বামী এটিএম সামসুদ্দিন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হন। একই যুদ্ধে শহীদ হন তার ছয় ছেলে ছায়েদুল হক (তৎকালীন সিলেটে রিলিফ অফিসার পদে কর্মরত ছিলেন), দেলোয়ার হোসেন, বেলায়েত হোসেন, খোয়াজ নবী, নুরের জামান ও আবুল কালাম। বাকি দুই ছেলে শাহ আলম ও শাহজাহান তার খোঁজ-খবর নেন না এবং তাদের সন্ধানও তিনি জানেন না। দুই মেয়ে মরিয়ম বিবি ও হাসনা বিবিও মারা গেছে।
মেহেরজান বিবির ভাষ্য, ‘পাকিস্তানি বাহিনী আমার স্বামী ও ছয় সন্তানকে হত্যা করে থেমে যায়নি। সেইসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার জানতে পেরে মিরপুরে আমার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আমি ঢাকার মিরপুরে বাংলা মিডিয়াম হাইস্কুলের (বর্তমানে মিরপুর বাংলা উচ্চবিদ্যালয়) শিক্ষিকা ছিলাম। স্বাধীনতার পর আমার দুঃখ-কষ্টের কথা শেখ মনির দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় ছাপা হলে তখন বঙ্গবন্ধুর নজরে আসি। বঙ্গবন্ধু আমি ও আমার পুত্রবধূ করফুলের নেছাকে ডেকে নিয়ে দুই হাজার টাকা করে অনুদান দেন এবং পবিত্র হজ পালন করান।’
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, মুক্তিযুদ্ধের পর স্বামী-সন্তানদের শহীদ হওয়ার খবরে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনেও তার পুরাপুরি মানসিক সুস্থতা ফিরে আসেনি। স্বজনদের হারিয়ে চরম অসহায়ত্বে পড়ে ভিক্ষার পথ বেছে নেন তিনি। ২০০৯ সালে ফেনী রেলস্টেশনে ভিক্ষা করতে দেখে এক জিআরপি পুলিশ তাকে ফেনী জেলা প্রশাসনে পাঠায়। তখন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয় ধর্মপুর আবাসন প্রকল্পে। সেই থেকে তিনি এখানে বসবাস করছেন।
জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায় বলেন, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্পে সুবিধাভোগীর একজন মেহেরজান বিবি। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের হিসেবে আমরা তাকে সার্বিক সহযোগিতা করবো।’
মেহেরজান বিবির কাছে থাকা কাগজপত্র থেকে জানা গেছে, মেহেরজান বিবি ১৯৩০ সালের ১০ অক্টোবর চাঁদপুর সদর উপজেলার বাবুরহাটের ২৬ নম্বর দক্ষিণ তরপুরচন্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইব্রাহীম উকিল। মা বিবি হনুফা। তারা ছিলেন ছয় ভাই-বোন। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ৬ নম্বর চরছান্দিয়া ইউনিয়নের বড়ধলী হাজি বাড়ির মরহুম মমতাজ উদ্দিনের ছেলে সুবেদার মেজর এটিএম সামসুদ্দিনের সঙ্গে মেহেরজান বিবির বিয়ে হয়। পঞ্চাশের দশকে বড়ধলী গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হলে নিঃস্ব হয়ে তারা শহরে চলে যান। বাসা ভাড়া করেন ঢাকার মিরপুর-১ নম্বরে জালাল দারোগার বাড়িতে।