লংগদু পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনি শংকর চাকমা বলেন, ‘সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। তারপরও যেহেতু গত দশ মাসেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য এখনো বাড়ি নির্মাণ হয়নি, সেহেতু বলবো সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আর এই তিনটি গ্রামের মানুষের আর্থিক অবস্থা এবং সামাজিক অবস্থা নেই বিজুর উৎসব করার মতো। তাই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এবার বিজু বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
রাঙামাটিতে ১০টি ভাষাভাষী ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা বর্ষকে বিদায় জানানোর এই অনুষ্ঠান তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচিত। এই উৎসব চাকমা জনগোষ্ঠী বিজু নামে, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষ বৈসুক, মারমা জনগোষ্ঠীর মানুষ সাংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বিষু, কোনও কোনও জনগোষ্ঠী বিহু নামে পালন করে থাকে।
বৈসুকের ‘বৈ’ সাংগ্রাইয়ের ‘সা’ ও বিজু, বিষু ও বিহুর ‘বি’ নিয়ে উৎসবটিকে সংক্ষেপে ‘বৈসাবি’ নামে পালন করা হয়।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ত্রাণ কমিটির আহ্বায়ক অশ্বীনি কুমার কার্বারী বলেন, ‘বিজু করার মতো আমাদের আর্থিক অবস্থা নেই। সরকার প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়, তা দিয়ে কি বিজু করা সম্ভব? তাছাড়া বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে, একটু বাতাস শুরু হলে ভয় করে কখন জানি টং ঘর বা ছোট্ট ঘরটি বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। এই অবস্থায় বিজু করা যায় না।’
১ নম্বর আটারকছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, ‘সরকার বার বার আশা দিয়েও এখনও বাড়ি ঘর নির্মাণ করে দিতে পারেনি। যাদের বাড়িঘর নাই, তারা কোথায় বিজু করবে। বিজু করার জন্য সেই পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। বিজু মানে আনন্দ, কিন্তু এই তিনটি গ্রামের মানুষের মনে কোনও আনন্দ নেই।’
৭ নম্বর লংগদু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য কুলিন মিত্র (আদু) বলেন, ‘পাহাড়ে সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব হলো বৈসাবি, আমরা বলি বিজু। বিজুতে আমাদের বাড়িতে অনেক বাঙালিরা আসতো, আমরাও ঈদের সময় তাদের বাড়িতে যেতাম। কিন্তু, গত বছর ২ জুন নয়নের হত্যাকে কেন্দ্র করে আমাদের তিনটি গ্রামে অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত দশ মাসেও সেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য গৃহ নির্মাণ করা হয়নি। সরকার আন্তরিক হলেও এখনও গৃহ নির্মাণ শেষ না হওয়া এবং সেই পরিবারগুলো আর্থিক সমস্যায় থাকায় তারা এবার বিজু বর্জনের সিন্ধান্ত নিয়েছে।’
উল্লেখ্য, লংগদুতে অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত ১৭৬টি ঘর নির্মাণের নিমিত্তে ২ বার দরপত্র আহ্বান করা হলেও ঠিকাদাররা কাজে অংশ নেয়নি। গত ২২ মার্চ তৃতীয় বারের মতো আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়,যা আগামী ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সিডিউল বিক্রি করা হবে।১৬ এপ্রিল বিকাল ৩টায় দরপত্র খোলা হবে। ঠিকাদারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে আগে চারটি প্যাকেজ করা হলেও নতুন দরপত্রে ছয়টি প্যাকেজ রাখা রয়েছে।
গত বছরের ১ জুন খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা চার মাইল এলাকায় লংগদু সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের লাশ পাওয়া যায়। ২ জুন লাশ নিয়ে বাইট্টাপাড়া থেকে লংগদু উপজেলা মাঠে লাশ নিয়ে মিছিল সহকারে আসার পথে তিনটিলা গ্রামসহ মানিকজোড়ছড়া ও পশ্চিম বাইট্টাপাড়ায় মোট ২১৩টি ঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।