মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহ হত্যার তদন্ত ও বিচার দাবি পরিবারের


মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লার স্ত্রী ও তার কন্যাচাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহ গাজী হত্যার সঠিক তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে তার পরিবার। মৃত ছফিউল্লাহর স্ত্রী ও সন্তানের অভিযোগ, ছফিউল্লাহকে গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যার পরও পুলিশ প্রতিবেদনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য, থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হলেও ঘটনাস্থলে তদন্ত না করে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষী না নিয়েই তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। হত্যাকারীরা এখন তাদের নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছে। আতঙ্কে এ ঘটনা সম্পর্কে খোলামেলা কথাও বলতে চাইছেন না তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের লবাইরকান্দি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহ গাজী ও তার ছোট ভাই রহমান গাজীর মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল। এরই সূত্র ধরে গত বছরের ২ অক্টোবর তাদের দুই ভাইয়ের স্ত্রীদের মধ্যে ঝগড়া হয়। পরে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ছফিউল্লাহর ওপর হামলা করে তার ছোট ভাই রহমান গাজী ও তার ছেলে বাদল গাজী। এসময় তাকে বাড়ির উঠোনে ফেলে রহমান গাজী গলাটিপে ধরে। এসময় স্ত্রী লাভলি বেগম স্বামীকে বাঁচাতে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। পরে ছফিউল্লাহর ছেলে সাগর তার বাবাকে উদ্ধার করতে এলে তাকে মারতে যায় বাদল গাজী। এ সময় চিৎকার শুনে ছফিউল্লাহকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার পর মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহর স্ত্রী বাদী হয়ে মতলব উত্তর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে পুলিশ রহমান গাজীকে গ্রেফতার করলেও পালিয়ে যায় তার ছেলে বাদল গাজী। পরবর্তীতে পুলিশ অভিযোগপত্রে বাদল গাজীর বিরুদ্ধে কোনও সাক্ষ্য না পাওয়ার কথা বলে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করে। সেই সঙ্গে ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলা হয়- মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
স্থানীয় রাহিমা বেগম ও হোসনে আরা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সেদিন চিৎকার শুনে তারা এসে দেখতে পান রহমান গাজীতার ভাই ছফিউল্লাহকে মেরে ফেলে রেখেছে।
স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূর আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রকাশ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে হামলা করেছে তার ছোট ভাই রহমান গাজী ও তার ছেলে বাদল। এখানকার মানুষজনও দেখেছে। এলাকার সবাই তা জানে। এমনকি বাদলের স্ত্রী আমার সামনে পুলিশের কাছে সাক্ষী দিয়ে বলেছে, তার শ্বশুর ছফিউল্লাহর বুকের ওপর বসেছিল আর তার স্বামী বাদল হাতে লাঠি নিয়ে এসে লাথি মেরেছে। আর এখন শুনি আসামির তালিকায় বাদলের নাম নেই। পুলিশ রিপোর্ট দিয়েছে- মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহ নাকি হৃদরোগে মারা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া এবং আসামিদের আইনের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা খুবই দুঃখজনক। আমরা এ হত্যার পুনরায় সঠিক তদন্ত এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
স্থানীয় ফারুক দেওয়ান বলেন, এখানে যা ঘটেছে তা এলাকার সবাই জানে। মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে। কিছুদিন আগেও বাড়ির পাশের দোকানে আমাদের সামনে ছফিউল্লাহর ছেলে সাগরকে হত্যার হুমকি দিয়ে বাদল গাজী বলেছে, ‘তোর বাবাকে মেরে ফেলেছি, এখন বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোকেও মেরে ফেলবো।’
নিহত মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহর ছেলে সাগর বলেন, ‘যেদিন বাবা মারা গেছেন সেদিন পুলিশ এসেছিল। সেদিন লোকজন সাক্ষী দিয়েছে। কিন্তু তারপর আসামিদের সঙ্গে যোগসাজস করে মামলা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে ঘাতকদের ঘরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তালা লাগিয়ে দেয়। সেই তালা খুলে দেওয়ার জন্য আরেকবার আসে পুলিশ। এরপর আর কখনোই তদন্ত করতে আসেনি পুলিশ।
অভিযুক্ত বাদল গাজী বলেন, ‘ঘটনার পর আমি পলাতক ছিলাম। আমার বাবাকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও পরে আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। এটি এখন অনেক পুরনো ঘটনা। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে এসেছে, তিনি হৃদরোগে মারা গেছেন। সবখানেই কাগজপত্র রয়েছে। তাই এ ঘটনা নিয়ে এখন কিছু বলবো না।’
এ বিষয়ে মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘বাদীপক্ষের অনেক সুযোগ আছে। তারা এ তদন্তে সন্তুষ্ট না হলে পুনরায় তদন্তের জন্য আবেদন করতে পারে। সেক্ষেত্রে ডিবি, পিবিআইকে তদন্তভার দেওয়া হলে এটি আরও ভালো তদন্ত হবে।’
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. শরীফ মাহমুদ সায়েম বলেন, ‘পুলিশ যে রিপোর্ট দিয়েছে তার ওপর নারাজি দিয়েছি। আদালত তা গ্রহণ করে শুনানির পর আগামী ২৩ মে আদালত আদেশের দিন ধার্য করেছেন।’
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার এম এ ওয়াদুদ বলেন, ‘আমি ঘটনাটি জানতাম না। শিগগিরই আমি মুক্তিযোদ্ধা ছফিউল্লাহ বাড়িতে যাবো। তাদের পাশে দাঁড়াবো।