এখনও শঙ্কায় লংগদুর অগ্নিদুর্গতরা!

লংগদুতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা এভাবেই দিন কাটাচ্ছেন অস্থায়ী টংঘরেস্থানীয় যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়নকে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাঙামাটির লংগদুতে পাহাড়িদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের একবছর পূর্ণ হয়েছে আজ। এই এক বছর ধরে আশ্রয়হীন অবস্থায় অথবা কোনোমতে একটা টংঘরের ব্যবস্থা করে দিন কাটাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত দুই শতাধিক পরিবার। গত ৩০ মে থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি উদ্যোগে বসতঘর নির্মাণ শুরু হয়েছে। মাথার ওপর একটা ছাউনির নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি স্থানীয় পাহাড়িদের মন থেকে। ফের কখন হামলার শিকার হতে হয়, এই ভয় এখন নিত্যসঙ্গী বলে জানিয়েছেন তাদের অনেকেই। স্থানীয়রা বলছেন, আগের চেয়ে এখন পরিস্থিতি ভালো, কিন্তু সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।  

গত বছরের ১ জুন লংগদু সদর ইউনিয়নের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মোটরসাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়ন ভাড়া নিয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পর বিকালে সেখানকার চার মাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। ২ জুন নয়নের লাশ নিয়ে জানাজার জন্য বাইট্টাপাড়া থেকে লংগদু উপজেলা পরিষদ মাঠে রওনা দিলে তিনটিলা পাড়ায় মিছিল আসার পর মিছিল থেকে হঠাৎ করে পাহাড়িদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ৩টি গ্রামের ২১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সরকার মোট ১৭৬টি বসতঘর নির্মাণ করার জন্য মোট ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এসব বসতঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয় ৩০ মে।লংগদুতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা এভাবেই দিন কাটাচ্ছেন অস্থায়ী টংঘরে

নয়নকে হত্যার ঘটনায় গত ৯ জুন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলে তারা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেয়। পুলিশ জানায়, রমেল চাকমা ও জুনেল চাকমা নামের এই দুই জন জিজ্ঞাসাবাদে জানায়- মোটরসাইকেল ছিনতাই করার জন্যই তারা নয়নকে হত্যা করে। তাদের স্বীকারোক্তিতে মাইনি নদী থেকে তার মোটর সাইকেল উদ্ধার করে পুলিশ।

পাহাড়িদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার বাদী কিশোর চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘ঘর ঠিক করে দিচ্ছে, কিন্তু নিরাপত্তা আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। আমি মামলা করেছি, কিন্তু অনেকে ছাড়া পেয়ে গেছে। আমরা চাই এসব ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের শাস্তি হোক। এদের ধরে আইনের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কী অপরাধ ছিল আমাদের? আমাদের বাড়িগুলো কেন পুড়িয়ে দিলো? আমরাও বলেছিলাম যারা নয়নকে মেরেছে তাদের ধরতে সাহায্য করবো, সবাই খুঁজে বের করবো। যারা দোষ করছে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করবো। এটা না করে আমাদের বাড়িগুলো পুড়িয়ে দিলো।’  শুরু হচ্ছে নতুন বাড়িঘর তৈরির কাজ

লংগদু সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়রাম্যান কুলিন মিত্র চাকমা (আদু) বলেন, ‘স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি আমরা সবাই সজাগ দৃষ্টি রাখছি আর যাতে এমন ঘটনা ঘটতে না পারে। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্টের জন্য যারা চেষ্টা করেছিল, তারা সেটি পারবে না।’

লংগদু থানার ওসি রঞ্জন কুমার সামন্ত জানান, ‘গত বছর ২ জুন যারা শান্তি-সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য চেষ্টা করেছিল তাদের আমরা আইনের আওতায় এনেছি। মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সিআইডিতে তদন্ত কাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার সব কিছুই নিতে আমরা প্রস্তুত আছি।’  আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলো এখনও এভাবেই পরিত্যক্ত

লংগদুতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বুধবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন, ‘এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যারাই জড়িত থাক না কেন তাদের কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।’ ক্ষতিগ্রস্ত পারিবারগুলোতে সাহায্য অব্যাহত রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভিজিএফ কার্ডের একবছর মেয়াদ আরও বৃদ্ধি করার ব্যাপারে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যে ১৮টি দোকান ঘর আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকার যাতে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেয় সেই বিষয়েও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করবো।’

আরও পড়ুন- 

টংঘরেই কাটবে আরেকটি বর্ষা?

'কীভাবে আছি কেউ খবরও রাখে নাই'