মোটর সাইকেলের হর্ন বাজানোকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে নিহত আবু জাফর অনিককে ছুরি মারে শোভন এবং ঘটনার সময় আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য ফাঁকা গুলি ছোড়ে মহিউদ্দিন তুষার। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ মুহাম্মদ আব্দুর রউফ এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত ১৭ জুন রাতে নগরীর চট্টেশ্বরী পল্টন রোডে তুষার ও শোভনসহ অন্যরা ছুরিকাঘাতে আবু জাফর অনিককে আহত করে। পরে তাকে উদ্ধার করে চমেক হাসাপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ হত্যা মামলার দুই আসামি এখলাসুর রহমান (২২) ও মহিউদ্দিন তুষারকে (৩০) কলকাতা থেকে গ্রেফতারের পর সোমবার দুপুরে বেনাপোল সীমান্তে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে ভারতীয় পুলিশ। ওই দিন রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকা থেকে পুলিশ অন্য দুই আসামি শোভন (২৪) ও তার ভাই ইমনকে (১৬) গ্রেফতার করে।
এরপর মঙ্গলবার (২৬ জুন) দুপুরে দামপাড়ায় সিএমপি পুলিশ লাইনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে নগর পুলিশ। সংবাদ সম্মেলনে অনিক হত্যা মামলার বিষয়ে ব্রিফ করেন সিএমপি কমিশনার মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘পুলিশি তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি ঘটনার দিন শোভনই অনিকের বুকে ছুরিকাঘাত করে। তার ছুরিকাঘাতেই অনিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই দিন অনিককে শোভন ছাড়াও তার ভাই ইমন ও মিন্টু ছুরিকাঘাত করে।’
উপ-কমিশনার শাহ মুহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, ‘তুষারের নেতৃত্বে ওই দিন ২৫ থেকে ৩০ জন উঠতি বয়সী তরুণ ঘটনাস্থলে ছিলেন। তাদের কাছে একটি পিস্তল ছিল, ওই পিস্তল দিয়ে তুষার ফাঁকা গুলি চালানোর পর শোভনসহ অন্যরা অনিককে ছুরিকাঘাত করে। পিস্তলটি তুষারের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ছুরিকাঘাতে অনিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তুষার ও এখলাস ওই দিন রাতেই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পালিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে ভারত হয়ে মালয়েশিয়া পালাতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু বেনাপোল হয়ে ভারতের কলকাতায় যাওয়ার পর সেখানকার পুলিশের কাছে তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। এ অবস্থায় দুজনকে নজরদারিতে রাখে কলকাতা পুলিশ। পরে আমরা তাদের (কলকাতা পুলিশ) সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা দু’জনের ভারতীয় ভিসা বাতিল করে তাদের বেনাপোল সীমান্তে প্রেরণ করে। বেনাপোল থেকেই চকবাজার থানা পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে।’
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘তুষার ও এখলাস দুজনের ভারত ও মালয়েশিয়ার ভিসা ছিল। আমরা তাদের পাসপোর্ট জব্দ করেছি। তাদের দুজনকে সোমবার রাতে চট্টগ্রাম নিয়ে আসার পর তুষারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতে তার বাসা থেকে একটি চায়না পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। পিস্তলটি ঘটনার সময় তুষারের কাছে ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি।’
সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীতে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অন্য ঘটনাগুলোতে আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করা গেলেও অনিক হত্যা মামলায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। আসামিরা ভারতে পালিয়ে যাওয়ায় এটি সম্ভব হয়নি। পালিয়ে তারা রেহাই পায়নি। অনিক হত্যার প্রধান চার আসামিকে গ্রেফতার করেছি।’
তিনি বলেন, ‘ভারতের স্পেশাল টাস্কফোর্সের সহায়তায় আমরা দুই আসামিকে খুব দ্রুত সময়ে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। আরও দুই আসামিকে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয়ে হত্যা মামলার আসামিরা ছাড় পাবে না। রাজনৈতিক পরিচয়, বড় ভাই-ছোট ভাই— এগুলো আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের গ্রেফতার করাটাই আমদের মেইন কনসার্ন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
গত ১৭ জুন রাতে নগরীর চট্টেশ্বরী পল্টন রোডে তুষার ও শোভনসহ অন্যরা ছুরিকাঘাতে আবু জাফর অনিককে আহত করে। পরে তাকে উদ্ধার করে চমেক হাসাপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে ওই দিন বিকালে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজানোকে কেন্দ্র করে অনিকের ভাই আবু হেনা রনিকের সঙ্গে নগরীর ব্যাটারিগলিতে ইমন, মহিন উদ্দিন তুষারসহ একদল তরুণের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। ওই বিষয়টি সমাধান করতে রাতে অনিক ও তার বাবা নাছির উদ্দিন সমাধান করতে গেলে তুষাররা তার বাবার সামনেই অনিককে ছুরিকাঘাত করে।
এ ঘটনায় অনিকের বাবা মো. নাছির উদ্দিন ১২ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার প্রধান আসামি মহিউদ্দিন তুষারসহ ৪ জনকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার হওয়া অন্য তিনজন হলো এখলাসুর রহমান, জোবায়েদ আহমেদ শোভন ও তার ভাই জোনায়েদ আহমেদ ইমন। তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।