পাহাড়ি এলাকায় সারাবছরই কলা উৎপাদিত হয়। কলা গাছের বিকল্প ব্যবহার না থাকায় ফল দেওয়ার পর গাছটি কেটে ফেলা হয়। কিন্তু এবার পরিত্যাক্ত কলার বাকল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে উন্নত মানের ফাইবার বা সুতা। সেই সুতা চড়া দামে বিক্রিও হচ্ছে।
খাগড়াছড়িতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা-আনন্দ এই প্রকল্পটি শুরু করেছে। এই প্রকল্পের প্রোগ্রাম অফিসার আশুতোষ রায় জানান,‘আমাদের দেশে কলা গাছের বাকল কোনও কাজে আসে না। কলা সংগ্রহের পর কৃষকরা গাছটি কেটে ফেলে। এটি পরিত্যাক্ত হিসেবে ধরা হত। কিন্তু পরিত্যাক্ত বাকল থেকে ফাইবার বা সুতা উৎপাদন করে সাফল্য পাওয়া গেছে। একটি কলা গাছের বাকল থেকে কমপক্ষে দুইশ’ গ্রাম ফাইবার পাওয়া যায়।’
তিনি আরও জানান,‘প্রতিটি কলা গাছ ১৫ টাকা দরে কেনা হয়। তবে পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় দূর থেকে কলা গাছ কিনতে গেলে খরচ বেড়ে যায়। ৫টি গাছের বাকল থেকে অন্তত এক কেজি সুতা পাওয়া যায়। যার বাজার মূল্য প্রায় ১৩০ টাকা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এই ব্যক্তি আরও জানান,‘কলা গাছের বাকল থেকে ফাইবার বা সুতা উৎপাদন অন্ত্যন্ত লাভজনক। কলার বাকল থেকে ফাইবার অংশ সংরক্ষণের পর অবশিষ্ট অংশ বার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন করা যায়। কৃষক পর্যায়ে বার্মি কম্পোস্টের চাহিদা রয়েছে। প্রতি কেজি কম্পোস্ট সার বিক্রি হয় ২০ টাকায়।
খাগড়াছড়ি জেলা সদরের গঞ্জ পাড়ায় চলছে এই সুতা উৎপাদনের কাজ। জার্মান দাতা সংস্থা ওয়েলথ হাঙ্গার হিলফ’এর অর্থায়নে আনন্দ ‘বিল্ডিং কমিউনিটি এন্টারপ্রাইজ অফ স্মল হোল্ডারস ইন বাংলাদেশ’ প্রজেক্টের আওতায় কলা গাছের বাকল থেকে সুতার তৈরির কাজ চলছে।
ওয়েস্ট এগ্রোর কারিগরি সহায়তা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা-আনন্দ এই কার্যক্রম শুরু করে। প্রকল্পের শুরুতে বিদ্যুতের লো-ভল্টেজের কারণে সুতা উৎপাদনে ধীর গতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে খাগড়াছড়িতে নতুন সাব স্টেশন হওয়ায় বিদ্যুতের লো-ভল্টেজের সমস্যা কেটে গেছে। ফলে বর্তমানে উৎপাদন বেড়েছে। তবে ধানকাটার মৌসুম হওয়ায় শ্রমিক সঙ্কট রয়েছে। এ কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
শ্রমিকদের কাজের ভিত্তিতে কমিশন দেওয়া হয়। প্রতি কেজি ফাইবাব বা সুতা উৎপাদনে একজন শ্রমিক ১৩ টাকা করে পায়। দৈনিক একজন শ্রমিক সর্বচ্চো ৫০ কেজি পর্যন্ত সুতা উৎপাদন করতে পারে।
সুতা উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত শ্রমিক আবুল হোসেন মিন্টু মারমা জানান,‘নিয়মিত বিদ্যুত থাকলে উৎপাদন ভালো হয়। তবে লোডশেডিং এর কারণে অনেক সময় উৎপাদন কমে যায়। ফলে সারাদিন কাজ করেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব হয় না। অনেক সময় সারাদিন কাজ করে ৩০০ টাকা আয় করতে কষ্ট হয়। উৎপাদিত সুতা দুই দিন ছায়ামুক্ত স্থানে শুকানোর পর তা গাইঢ বেঁধে বাজারজাত করা হয়।’
এই প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান,‘কলার বাকল থেকে পাওয়া সুতা বা ফাইবার জুট কটনের সঙ্গে মিশিয়ে পেপার, হ্যান্ডি ক্রাফট, হ্যান্ডব্যাগসহ নানা পণ্য তৈরি করা যায়।
আনন্দ’র নির্বাহী পরিচালক মো.মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, ‘সুতা বা ফাইবার উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা হল এটি পরিত্যাক্ত কলারবাকল থেকে তৈরি হয়। পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর কলা হয়,এখানে কলা গাছ সহজলভ্য। কলা গাছের বাকল থেকে প্রাপ্ত সুতা অত্যন্ত টেকসই ও মানসম্পন্ন। জুট বা কটনের সাথে মেশানো হলে এটি আরও টেকসই হয়। দলিল বা স্ট্যাম্প অর্থ্যাৎ দীর্ঘ মেয়াদী কাগজের জন্য এই ফাইবার বেশ উপযুক্ত।
তিনি আরও জানান ‘বর্তমানে প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে খাগড়াছড়িতে চালু হয়েছে। এটি সফলতা পেলে এই প্রকল্পটি আরও সম্প্রসারণ করা হবে।’