‘রেজাউলকে ধাক্কা দেয় হেলপার, শরীরের ওপর গাড়ি চালিয়ে দেয় ড্রাইভার’

স্বামীকে হারিয়ে কাঁদছেন সান্তা ইসলাম‘রেজাউল করিম গাড়ি থেকে নামার সময় চালকের সহযোগী (হেলপার) তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পরে তার শরীরের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয় চালক। এতে রেজাউলের মৃত্যু হয়। আমরা খুনি চালক ও তার সহযোগীর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’ কথাগুলো বলছিলেন বাসচাপায় নিহত রেজাউলের প্রতিবেশী জিল্লুর রহমান।
সোমবার (২৭ আগস্ট) বিকালে চট্টগ্রাম নগরীরর সিটিগেট এলাকায় চার নম্বর রুটে চলাচল করা একটি বাস রেজাউলকে চাপা দিলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রেজাউলকে মৃত ঘোষণা করেন।
রেজাউলের প্রতিবেশী জিল্লুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সোমবার দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে রেজাউল আমাকে ফোন করে বলে, সে ভাটিয়ারি থেকে চার নম্বর রুটের একটি বাসে চড়ে সিটি গেট আসছে। বাসে তার সঙ্গে চালক ও হেলপারের ঝামেলা হচ্ছে। আমাকে গ্ল্যাস্কো অফিসের পাশের বাসস্ট্যান্ডে দ্রুত আসার জন্য বলা হয়। ’
জিল্লুর আরও বলেন, ‘এরপর আমি রেজাউলকে কল করেই যাচ্ছি। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করছিলেন না। পরে একজন লোক ফোন ধরে জানান, রেজাউল গাড়ি চাপায় আহত হয়েছেন। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রেজাউলকে মৃত ঘোষণা করেন।’দাদার কোলে বাবা হারানো একমাত্র কন্যা সন্তান সাবা
এদিকে বাসের চালক ও হেলপারের হিংস্রতায় মাত্র দেড় বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছে একমাত্র শিশু সন্তান সাবা।
মঙ্গলবার দুপুরে রেজাউলের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সাবা তার দাদার কোলে চড়ে এদিক-ওদিক ঘুরছেন। বাসার সামনে বসে কাঁদছেন সাবার মা সান্তা ইসলাম। ছোট্ট সাবা কাকে বাবা ডাকবে এসব কথা বলে বারবার তিনি কেঁদে উঠছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সান্তা ইসলাম বলেন, ‘আমরা মেয়ে কাকে বাবা ডাকবে? যারা আমার স্বামীকে হত্যা করেছে আমি তার বিচার চাই। যাদের কারণে আমার ছোট্ট মেয়েটি পিতৃহারা হয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
বাড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্সে রাখা রয়েছে রেজাউলের লাশ। শেষবারের মতো একবার দেখতে অ্যাম্বুলেন্সের চারপাশ ভিড় করছেন আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশীরা। সবার মাঝে ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, সামান্য কথাকাটাকাটির জের ধরে বাসের চালক ও তার সহযোগী গাড়িচাপা দিয়ে রেজাউলকে হত্যা করেছে।
রেজাউলরা এক ভাই, দুই বোন। সিটিগেট এলাকার কালীরহাটে তাদের বাড়ি। মা-বাবা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী হলেও রেজাউল স্ত্রীকে নিয়ে নিজ বাড়িতে থাকতেন।
রেজাউলের বোনের ছেলে মোহাম্মদ ইয়াছিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মামা পাঁচ বছর আগে বিয়ে করেন। মামিকে নিয়ে নিজেদের বাড়িতে থাকতেন। নানা-নানি যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। নানি রমজানের ঈদের আগে দেশে আসেন। আর নানা কোরবানির ঈদের ১০-১৫ দিন আগে এসেছেন। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তারা নির্বাক।
ছেলের একমাত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে কাঁদছেন নিহত রেজাউলের বাবা ওয়ালি উল্লাহ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘সামান্য কথাকাটাকাটিকে কেন্দ্র করে তারা (বাসের চালক-সহযোগী) আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’রেজাউলকে শেষবারের মতো দেখতে এলাকাবাসীর ভিড়
তিনি আরও বলেন, ‘ছোট্ট একটা ঘটনার জন্য একজনের প্রাণ কেড়ে নেবে, এটা হতে পারে না। ছোট্ট একটা ঘটনার জন্য একটা মানুষ মরতে পারে না। কোনোভাবেই মরতে পারে না।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চার নম্বর রুটে চলাচলকারী ওই বাসের চালক ছিলেন দিদারুল আলম (৩৫) ও তার সহযোগী ছিলেন মানিক (২৫)। পুলিশ তাদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করেছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনও মামলা দায়ের করা হয়নি।
আকবর শাহ থানার ওসি জসিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি হত্যা না দুর্ঘটনা, আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে বাসে রেজাউলের সঙ্গে চালক ও হেলপারের কথাকাটাকাটির বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি। ওই কথাকাটাকাটির জের ধরে তাকে বাসচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, নাকি তাড়াহুড়ো করে বাস থেকে নামতে গিয়ে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’
ওসি আরও বলেন, ‘রেজাউল বাসচাপায় মারা যায়নি। বাস তাকে চাপা দিলে তার শরীরের ওই অংশ থেঁতলে যেতো। কিন্তু লাশের সুরতহাল করার সময় আমরা লাশের শরীরে এ ধরনের কোনও চিহ্ন পাইনি। তার মাথার পেছনে জখমের চিহ্ন ছিল। আর দুই হাতের কনুইতে আঘাত পেয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, চালকের সহযোগী তাকে ধাক্কা দিলে মাথায় পাওয়া আঘাতের কারণে তার মৃত্যু ঘটে।’
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বাসের চালক ও তার সহযোগীকে গ্রেফতার করা গেলে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। আমরা বাসের চালক ও তার সহযোগীকে ধরার চেষ্টা করছি। তাদের ঠিকানা আমরা পেয়েছি। দুজনকে গ্রেফতার করতে অভিযান শুরু হয়েছে।’