চলমান সংঘাতে বিপাকে ইউপিডিএফ সমর্থিত চার উপজেলা চেয়ারম্যান

খাগড়াছড়িখাগড়াছড়িতে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর চলমান সংঘাতে চরম বিপাকে পড়েছেন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সমর্থিত ও নির্বাচিত চার উপজেলা চেয়ারম্যান। চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে লক্ষিছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা ও পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সর্বোত্তম চাকমা আত্মগোপনে আছেন। অন্যদিকে, গুইমারা উপজেলা চেয়ারম্যান উশ্যেপ্রু মারমা ও খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান চঞ্চুমনি চাকমাকে নিজ নিজ এলাকায় মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করছেন তারা।

জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা খুন ও অস্ত্রসহ একাধিক মামলার আসামি হয়ে গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে আছেন দীর্ঘ তিন মাস ধরে। অন্যদিকে, নিরাপত্তাজনিত কারণে পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান গা-ঢাকা দিয়েছেন ৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে।

উভয় উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছিল। তবে গত দুই মাস ধরে পানছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ভাইস চেয়ারম্যান মো. লোকমান হোসেন। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ফাইল জটিলতা কম হলেও মূল চেয়ারম্যান দীর্ঘদিন না থাকায় স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব শূন্যতা অনুভব করছেন এলাকাবাসী।

অন্যদিকে, লক্ষিছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যানের অনপুস্থিতিতে থেমে আছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। শত শত ফাইল পেন্ডিং পড়ে আছে। ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।

নিরাপত্তাজনিত কারণে খাগড়াছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান চঞ্চুমনি চাকমা তাঁর উপজেলা কার্যালয় অফিসেই পরিবার পরিজনসহ অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছেন। প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা না থাকলেও জনসম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে। তিনি সহজেই কোনও এলাকাবাসীর সঙ্গে দেখা করতে চান না। একই অবস্থা গুইমারা উপজেলা চেয়ারম্যান উশ্যেপ্রু মারমার ক্ষেত্রেও ।

এই অবস্থায় সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে স্বপন চাকমা, রতন চাকমা, পাইসাউ মারমা, চাইলাপ্রু মারমা, হাশেম চৌধুরী, বেলাল হোসেনসহ অর্ধশতাধিক এলাকাবসীর পক্ষ থেকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর লক্ষিছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা এলাকায় না থাকায় অফিসিয়াল কাজ কর্ম থেমে আছে। প্রতিনিয়িত তার দফতরে ঠিকাদারি ফাইলসহ বিভিন্ন ফাইল টেবিলে গেলেও স্বাক্ষর না হওয়ায় ফাইল ফেরত আসছে না। অনেক উন্নয়ন কাজ থমকে আছে। নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার মানুষ। এতে করে চলমান কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা রয়েছে। অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিনি জেল খেটেছেন। সেই মামলাটিও চলমান। এমতাবস্থায় কোনও ব্যবস্থা না নেওয়া হলে লক্ষ্মীছড়িবাসী চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়বে।

এদিকে গত ২০ সেপ্টেম্বর লক্ষিছড়ি উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভা হওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তা স্থগিত করা হয়। অভিযোগ ওঠেছে আত্মগোপনে থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান সুপার জ্যোতি চাকমা সরকারের উচ্চমহলে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিগত আরও দুটি সভা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পরিচালনা করলেও তৃতীয় সভা স্থগিত করা হয়।

উপজেলা চেয়ারম্যান এলাকায় না থাকতে পেরে সভা করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদ ইকবাল বলেন, ‘এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে একটা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি, তা জেলা প্রশাসককে পাঠানো হয়েছে।’ সমন্বয় সভা কখন হচ্ছে এ বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করে কিছুই বলতে পারেন নি।

বিভিন্ন সময় ও তারিখে ইউপিডিএফ সমর্থিত লক্ষিছড়ি, পানছড়ি, খাগড়াছড়ি ও গুইমারা উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণে স্বাভাবিক চলাফেরাসহ জনসাধারণের মঙ্গলে অনেক কিছু তারা করতে পারছেন না।

তারা আরও জানান, জনগণের পক্ষে কথা বলা, প্রতিবাদ করা ও অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখার কারণেই আজ তারা নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। সরকার যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে তার জনসেবা দিয়ে যেতে পারবেন বলে তারা বিশ্বাস করেন।

জেলা ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা মুখপাত্র নিরন চাকমা বলেন, ‘শুধুমাত্র ইউপিডিএফ সমর্থনে জয়লাভ করায় আজ ৪ উপজেলা চেয়ারম্যান কোনঠাসা অবস্থায় আছে। সরকার স্থানীয় প্রশাসন ও সন্ত্রাসীদের দিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানির চেষ্টা করছে। মামলা-হামলা করে জনগণের প্রতিনিধিদের দমন করা যাবে না।’

জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম ও জেলা পুলিশ সুপার মো. আহমার উজ্জামান বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি প্রশাসনকে জানাতে হবে এবং প্রশাসন জানা থাকলে সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া প্রশাসনের জন্য সুবিধা হবে।’