জুমের ফসল ঘরে তোলায় ব্যস্ত জুমিয়ারা

জুমের ফসল কাটছেন চাষিরাপাবর্ত্য জেলা রাঙামাটিতে জুমের ফসল কাটা শুরু হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ফসল কাটা এবং সংগ্রহ করছেন চাষিরা।  পাকা ধান কেটে পিঠের ঝুড়ি করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। গত কয়েকদিন ধরে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে পাহাড়ে। ধান ছাড়াও এবার চাষ করা হয়েছে মারফা, বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়শ, কাকরোল, আদা, পেঁপে ও কুমড়াসহ নানা ধরনের সবজি। প্রায় সব ফসলেরই বাম্পার ফলন হওয়ার পাহাড়িদের মুখে হাসি ফুটেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০ ভাষাভাষির ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর বসবাস। তিন পার্বত্য জেলায় বসবাতরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর প্রাচীনতম পেশা জুম চাষ। তাই তাদের জুমিয়া বলা হয়। যুগ যুগ ধরে পাহাড়িরা এই পদ্ধতিতে চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। পাহাড়ে ফসল চাষের পদ্ধতিকে চাকমা  ও তঞ্চঙ্গা ভাষায় ‘জুম’, ত্রিপুরা ভাষায় ‘হু’, মারমা ভাষায় ‘ইয়া’, পাংখোয়া ও লুসাই ভাষায় ‘লাউ’, চাক ভাষায় ‘ইকপ্রা’, খেয়াং ভাষায় ‘লউ’,  ও খুমী ভাষায় ‘ল’ বলা হয়ে থাকে।  তবে আদিবাসী ছাড়া অন্যদের কাছে তা জুম নামেই বেশি পরিচিত।

জুমের ফসল জুম চাষের জন্য প্রথমে স্থান নির্বাচন করা পরে নির্ধারিত স্থানে কয়েকদিনপর শুরু পাহাড়ের গাছ কাটা। গাছ কাটা শেষ হলে একমাস রোদে শুকানোর পর আগুনে পোড়ানো হয়। এটি মূলত কর হয় চৈত্র মাসে। এরপর সব আগাছা পরিষ্কার করে বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় বীজ বপনের পর তিনবার আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। এবার ধান ছাড়াও একই জমিতে তুলাসহ নানা ধরনের সবজির চাষ করা হয়েছে। 

জুম চাষ

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১০ উপজেলায় উফশী ৪৮৪ হেক্টর জমি, স্থানীয় (জুম) ৫৯২৯ হেক্টর মোট ৬৪১৩ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে। অর্জিত আবাদ উফশী ৩৯৩ মেট্রিক টন এবং স্থানীয় (জুম) ৫৮২৯ মেট্রিক টন। এরই মধ্যে বেশিরভাগ ফসল কৃষকরা সংগ্রহ করে ফেলেছেন বলে জানিয়েছে কৃষি অফিস।

জুমের ফসল রাঙামাটির কাপ্তাই সড়কের মোরঘোনা এলাকার জুমচাষি অরিজিৎ চাকমা বলেন, ‘এবছর প্রায় ২ একর জমিতে জুম চাষ করেছি। এরমধ্যে জুমের ধান কাটা শুরু করেছি। অন্যান্য সফলের কিছু বিক্রি করেছি। গতবছরের চেয়ে এবার ফলন অনেকটা ভালো হয়েছে। তারপরও সার, বীজ ও অন্যান্য খরচ দিয়ে যা ফলন পাওয়া যায় বছরের অর্ধেক সময় খাওয়া যায়।’

Rangamati-Jum-pic-(8)

জুমের ধান কাটতে আসা কল্পনা চাকমা বলেন, ‘এই সময়ে কিছুটা কাজের সুযোগ তৈরি হয়। জুমের ধান কাটার জন্য পারিশ্রমিক প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে পাই, তা দিয়ে সংসারে কাজে আসে।’

ফসল কাটছেন এক নারী চাষিরাঙামাটির বড়াদম এলাকার জুমিয়া আনন্দ বিকাশ চাকমা বলেন, ‘এটি আমাদের ঐতিহ্যবাহী চাষ পদ্ধতি। এখন আর আগের মতো ফলন পাওয়া যায় না। তারপরও এটা ছাড়া অন্য চাষের ব্যবস্থা না থাকার কারণে আমাদের এটাই করতে হয়। কারণ এক জমিতে অনেকগুলো ফল চাষ করা যায় এই জুমে চাষের মাধ্যমে।’

Rangamati-Jum-pic-(1)

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক পবন কুমার চাকমা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জুম আবাদ হয়েছে। গত বছর পাহাড় ধসের কারণে আবাদ কিছুটা কম হলেও এবছর ফলন ভালো হয়েছে। ধানের সঙ্গে সঙ্গে যেসব ফসল চাষ হয়েছে তারও ফলন ভালো হয়েছে।’

Rangamati-jum-pic-(10)

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নতুন কিছু প্রজাতির ধান এবছর থেকে জুমিয়াদের দিয়েছিলাম। সেগুলোর কারণে প্রতি হেক্টরে ৩ টন এর বেশি করে ধান উৎপাদন হয়েছে।’