ইটভাটায় অপরিচিত কেউ আসলেই লুকিয়ে যায় শিশু শ্রমিকরা

অপরিচিত কাউকে দেখলেই এভাবে লুকিয়া যায় শিশু শ্রমিকরাকুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কিং অ্যান্ড কো. ইটভাটায় ট্রাক উল্টে ১৩ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় জেলার অন্যান্য ইটভাটা মালিকরা আতঙ্কে আছে। এ ঘটনার পর থেকে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন ভাটায় অভিযান চালাচ্ছে। তাই বলে অনিয়ম থেমে নেই। ভাটাগুলোয় এখনও কাজ করছে শিশুরা। ইটভাটায় অপরিচিত কেউ গেলেই কর্তৃপক্ষ শিশু শ্রমিকদের লুকিয়ে ফেলেন। কুমিল্লার একাধিক ইটভাটা ঘুরে এমনটাই দেখা গেছে। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবুল ফজল মীর জানান, অভিযানের সময় চোখে পড়লেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে ইটভাটা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

কুমিল্লার ১৭ উপজেলায় বৈধ ও অবৈধ প্রায় ৪ শতাধিক ইটভাটা রয়েছে। তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি চৌদ্দগ্রাম ও মুরাদনগর উপজেলায়। এসব ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকদের বেশিরভাগই শিশু। তাদের বয়স ৯ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর। তাদেরকে বিভিন্ন সিন্ডিকেট ও সর্দারের মাধ্যমে চুক্তিতে স্বল্প মজুরিতে ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করানেরা হয়।

১২ বছরের শিশু শ্রমিক বাবলুর দেখা মেলে হক ব্রিক ফিল্ডে। ছোট-বড় মিলিয়ে তারা প্রায় ৩০জন নোয়াখালী থেকে কুমিল্লার ওই ইটভাটায় আসেন। স্কুল ছেড়ে তিন মাস ধরে ইট বানানোর কাজ করতে এসেছে সে। অভাবের সংসারে কিছু টাকা আসবে এই ভেবেই স্কুল বাদ দিয়ে ইটভাটায় কাজ করতে এসেছে সে। ৪০ হাজার টাকায় ছয় মাসের চুক্তিতে সে কাজে এসেছে।

বাবলু বলেন, ‘প্রতিদিন ১৪শ থেকে ১৫শ কাঁচা ইট তৈরি করে। কোনোদিন একটু কম হলে সর্দার ও মালিক গালাগালি করেন।’

হক ব্রিক ফিল্ডের পরিচালক আল ইমরান বলেন, ‘জেলা পরিবেশ অধিদফতরের আইন অনুসরণ করেই আমরা ইটভাটা পরিচালনা করছি।’ শ্রম আইন এবং শিশু শ্রমের বিষয় জানতে চাইলে ওই পরিচালক কোনও উত্তর দিতে পারেননি।

ইটভাটায় কাজ করছেন শ্রমিকরাসর্দার হেলাল মেম্বার কুমিল্লার বিভিন্ন ইটভাটায় শ্রমিক সরবরাহ করেন। হক ইটভাটায় তার ৫০ শ্রমিক রয়েছে। তারমধ্যে বেশিরভাগ ১০-১৫ বছর বয়সী শিশু। তিনি বলেন, ‘ইটভাটার মালিকদের চাহিদা অনুসারে চুক্তিতে শ্রমিক দেওয়া হয়। তবে তারা ওই শ্রমিকদের থাকা এবং খাওয়ার ব্যাপারে কোনও দায়িত্ব নেন না।’  

অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৭ মাসের চুক্তিতে নোয়াখালী থেকে কুমিল্লার হক ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে এসেছেন মো. বাবুল। তিনি জানান, ইট তৈরির মৌসুম হিসেবে সর্দার বেশি মজুরির আশ্বাস দিয়ে ইটভাটায় নিয়ে আসেন। সাত মাসের চুক্তিতে যে মজুরি দেওয়ার কথা থাকে তা পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, ‘ইটভাটায় স্বল্প মজুরিতে কাজ করলেও চুক্তির বাইরে একদিনও ছুটি পাওয়া যায় না। সাত মাসের চুক্তির একদিন বাকি থাকলেও সর্দার ও মালিক একটাকাও দেবেন না বলে জানান। অসুস্থ বা কোনও কারণে একদিনের জন্য বাড়িতে যেতে হলে ইটভাটায় একজনকে মাধ্যম দিয়ে যেতে হয়। থাকা ও খাওয়ার কোনও ব্যবস্থা রাখেন না কর্তৃপক্ষ। অনেক সময় ভাটায় ঘুমাতে হয়। আমরা গরিব বলে মানুষ হিসেবে আমাদের কোনও মূল্য নেই।’ 

বিভিন্ন ইটভাটায় শ্রমিকরা জানান, অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইট বানানোর কাজ করতে হয় তাদের। আর এই কাজটি চুক্তিতে হয়। ভাটায় কাজ করতে হয় সর্দারের মাধ্যমে। পুরো সাত মাসের জন্য সর্দারই শ্রমিকের সঙ্গে চুক্তি করেন। কাজ শুরু হওয়ার আগে সর্দার কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে শ্রমিককে দাদন দিয়ে রাখেন। ইট বানানোর কারিগরদের দেওয়া হয় সবচেয়ে বেশি টাকা। ৬ মাসের জন্য কারিগর প্রতিদিন ১৬-১৭ ঘণ্টা কাজ করে ১ লাখ, জোগালি ৪০ হাজার, আগাটক ৭০ থেকে ৮০ হাজার, গোড়ারটক ৬০ থেকে ৭০ হাজার এবং মাটি বহনকারী ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। চুক্তির বাহিরে সাতদিনে খোরাকির জন প্রতি শ্রমিক পান ৩০০-৪০০ টাকা করে।

ইটভাটায় কাজ করছেন শ্রমিকরা

শ্রমিকরা আরও জানান, দুই শিফটে কাজ করতে হয় তাদের। ফজরের আজানের পরপরই শুরু হয় তাদের কর্মজীবন। চলে দুপুর পর্যন্ত। সামান্য বিরতি দিয়ে সন্ধ্যা ৭-৮টা পর্যন্ত তাদের কাজ চলে। তাদের মাঝে ভাগ করে কয়েকজন দিনে কয়েকঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পান। বিনিময়ে তাদের কাজ চলে সারারাত। আশানুরূপ কাজ বুঝে না পেলে শ্রমিকদের ওপর চলে অমানুসিক নির্যাতন। শিশু শ্রমিকদেরকে শারীরিক নির্যাতনেরও অভিযোগ আছে। ইটভাটার পাশেই টিনের ঘর তুলে এক রুমে ১৫-১৮ শ্রমিক থাকতে হয়। সেখানে নিজেরা তিনবেলা রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা করেন।

শিশু শ্রমের বিষয়ে কুমিল্লায় জেলা প্রশাসক আবুল ফজল মীর বলেন, ‘ইটভাটায় ১৩ শ্রমিক নিহতের ঘটনার পর কুমিল্লার অন্যান্য ইটভাটাগুলো আমাদের নজরে রয়েছে। আমাদের মোবাইল কোর্ট মাঠে রয়েছে। অভিযোগ পেলেই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছি। গত কয়েকদিনে জেলা প্রশাসন একাধিক ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’