সেন্টমার্টিনে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ চলছেই

01দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে কোনও স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের ওপর বিধি-নিষেধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। দিনের পর দিন স্থাপনা তৈরি অব্যাহত রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত তিন বছরে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করেছে কিছু প্রভাবশালী মহল। এতে করে এই দ্বীপটি আগামীতে হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করে পরিবেশবাদীরা।
সূত্র অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে উপকূলীয় ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে পরিবেশ অধিদফতর সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুসারে, সংকটাপন্ন ওই এলাকায় সরকারি অনুমোদন ছাড়া সব ধরনের ভৌত নির্মাণকাজ, নির্মাণকাজে পাথর ও প্রবাল শিলার ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও সেন্টমার্টিন দ্বীপে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ভেঙে ফেলা, ভবিষ্যতে যেন পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনও স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া; কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, কচ্ছপসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর চার সচিব, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ ১১ সরকারি কর্মকর্তাকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সম্প্রতি, সেন্টমার্টিনে কয়েকটি পাকা দালান নির্মাণ করা হচ্ছে। বিষয়টি নতুন করে সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে। সেন্টমার্টিনের পশ্চিম পাড়া সমুদ্র সৈকতের পাশেই একটি স্থায়ী পাকা ভবনের নিচতলার নির্মাণ কাজ চলছে। সেখানে কাজ করছেন ৬-৭ জন শ্রমিক।
স্থানীয়রা জানান, নির্মাণকাজ শেষে ভবনটি আবাসিক হোটেল হিসেবে চালু করা হবে।
শ্রমিক আব্দুল কাদের জানান, প্রায় ১৫-২০ দিন ধরে এ ভবন নির্মাণের কাজ করছেন তারা। কেউ কখনও কাজে বাধা দেয়নি।
হোটেলটি নির্মাণের বৈধতা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব বিষয় আমি বলতে পারবো না। মালিকপক্ষই ভালো জানেন।
একইভাবে পশ্চিম কোনাপাড়া সৈকতের কাছে অবস্থিত ‘রিসোর্ট লাবিবা বিলাস’। সেখানেও তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে প্রকাশ্যে। ৭-৮ জন শ্রমিক সেখানে কাজ করছেন। শ্রমিক আবু তাহের বলেন, দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত কাজ শেষ করে হোটেল ব্যবসা চলছে, এখন চলছে তৃতীয় তলার কাজ।’
রিসোর্টের ম্যানেজার আবদুস সালাম বলেন, ‘আমি রিসোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি নির্মাণ কাজ দেখাশুনা করি। এখন হোটেলটি তিন তলা করা হচ্ছে। আমাদের কেউ কখনও বাধা দেয়নি।’
02শুধু এ দুটি স্থাপনা নয়, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবৈধভাবে প্রতিদিন প্রকাশ্যে গড়ে উঠছে একের পর এক স্থাপনা। এখন সেখানে হোটেল রিসোর্ট লাবিবা বিলাস, সমুদ্র কুটিরসহ ৮-৯টি ছোট-বড় স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। গত তিন বছরে সেখানে অবৈধভাবে অর্ধশতাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
জানতে চাইলে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হোটেল ফ্যান্টাসি, রিসোর্ট লাবিবা বিলাস, সমুদ্র কুটিরসহ যেসব হোটেল গড়ে উঠছে তাদের বাধা দিয়েও থামানো যাচ্ছে না। একদিকে বাধা দিলে আরেক দিকে কাজ শুরু করে। কয়েকটি স্থাপনার নির্মাণ সামগ্রীও জব্দ করা হয়েছিল, কিন্তু তারা ঠিকই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া প্রভাবশালীদের জন্য স্বয়ং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উল্টো চাপ প্রয়োগ করেন।’
পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন, ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সেখানে সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ আইন লঙ্ঘন করে শতাধিক হোটেল-মোটেল তৈরি হয়েছে। লোকবল সংকটের কারণে কক্সবাজার শহর থেকে সেন্টমার্টিনে গিয়ে এসব তদারকি সম্ভব হচ্ছে না। এরপরও পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে কয়েকদিন পর পর বিভিন্ন নির্মাণ কাজ বন্ধ করা হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ যেকোনও মূল্যে বন্ধ করা হবে। সেখানে কেউ জড়িত থাকলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।’

এদিকে সূত্র জানিয়েছে, সেন্টমার্টিন দ্বীপে স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, পরিবেশ অধিদফতর, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি চক্রকে ম্যানেজ করতে হয়। এসব দফতরের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে প্রকাশ্যে টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটারের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইট, লোহা, সিমেন্ট, বালিসহ যাবতীয় নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছে যায় সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সংশ্লিষ্ট দফতর ম্যানেজ থাকায় এসব নির্মাণ সামগ্রী নির্বিঘ্নে নির্মাণস্থলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সেখানেও কোনও বাধা ছাড়াই গড়ে উঠছে হোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁ। এভাবে অবৈধ পন্থায় একের পর এক স্থাপনা গড়েছে। গত তিন বছরে শতাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। আর এতে করে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ওই দ্বীপের ভবিষ্যত ঝুঁকিতে ফেলেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইন ও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সেন্টমার্টিনে প্রকাশ্যে স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে দ্বীপটি ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতোমধ্যেই দ্বীপটির একাংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। দ্রুত এসব রোধ করা না গেলে দ্বীপটিতে যেকোনও সময় বিপর্যয় ঘটতে পারে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকলেও সেন্টমার্টিনে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল-মোটেলসহ নানা স্থাপনা। আদালতের দেওয়ার পাঁচ বছরের বেশি সময় পার হলেও নির্দেশ অনুযায়ী সেন্টমার্টিন ও এর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যর্থতা দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম অবজ্ঞা ও উদাসিনতার পরিচায়ক। একইসঙ্গে আদালত অবমাননার সামিল।’