ফোনে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ নুসরাতের মা ও ভাইয়ের

নুসরাতের বাড়িতে পুলিশি প্রহরা (ছবি– প্রতিনিধি)

যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদের কারণে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আক্তার ও ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাহমুদুল হাসান নোমানের অভিযোগ, ‘শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) জুমার নামাজের আগে আমাকে এবং এদিন সকালে আমার মাকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে।’ এ তথ্য নিশ্চিত করে সোনাগাজী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. খালেদ হোসেন জানিয়েছেন, অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মাহমুদুল হাসান নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুক্রবার জুমার নামাজের আগ মুহূর্তে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল দিয়ে আমাকে গালাগাল ও হুমকি দেওয়া হয়। এর আগে সকালে আমার মায়ের ফোনেও কল করে হুমকি দেয় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা।’ বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছেন বলেও জানান নোমান।

নোমান আরও অভিযোগ করেন, ‘নুসরাত হত্যার রায় ঘোষণার আগ মুহূর্তে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা আমাদের বাড়ির টেলিভিশনের ডিশ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ছয় ঘণ্টা পর পুলিশের হস্তক্ষেপে ডিশ সংযোগের মালিক নতুন তার দিয়ে লাইন সচল করেন।’মাহমুদুল জানান, বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনিসহ তার পরিবারের সদস্যরা ফেনী আদালতে যান। দুপুরে বাড়ি ফিরে দেখতে ডিশের সংযোগ বিচ্ছিন্ন দেখতে পান।

পরিদর্শক (তদন্ত) মো. খালেদ হোসেন বলেন, ‘ফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পরিবারটির নিরাপত্তায় বাড়িতে দুইজন কর্মকর্তাসহ ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে রয়েছেন। একইভাবে পৌর শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোয়ও পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।’

এর আগে নুসরাত হত্যার রায়ের দিন বৃহস্পতিবার আদালত চত্বরে মাহমুদুল হাসান নোমানকে হুমকি দেওয়া হয়। এদিন বেলা ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে রায় পড়া শুরু করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। ১৭২ পৃষ্ঠার রায়ের চুম্বক অংশ শোনার পরই আসামিরা চিৎকার শুরু করে; কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ে। এজলাস থেকে আসামিদের জেলা কারাগারে ফেরত নেওয়ার সময় তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাহমুদুল হাসান নোমানকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়।

রায় ঘোষণার পর দণ্ডিত আফসার উদ্দিন উপস্থিত সাংবাদিক ও বাদীপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশ করে গালিগালাজ করে; আসামি শামীমও গালমন্দ করে। অন্য দণ্ডিতরা উচ্চ আদালতে আপিল করবে বলে চিৎকার করতে থাকে। এ সময় আসামি আবদুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, “কেয়ামতের দিন তোদের বিচার হবে।” আর নুসরাতের বড় ভাই মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমানকে মুক্তি পেয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় আসামি আফসার। নোমানকে উদ্দেশ করে আফসার বলে, “তোর বোন অগ্রযাত্রা করেছে। তোরা হত্যা বলে চালিয়ে দিয়ে এতগুলো মানুষকে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছিস। এর শেষ কোথায়, দেখে নেবো।’

বেলা ১১টা ২১ মিনিটে নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ। রায়ে নুসরাত জাহান রাফিকে হাত-পা বেঁধে পুড়িয়ে হত্যায় ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একইসঙ্গে আসামিদের প্রত্যেককে একলাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। এই টাকা আদায় করে নুসরাতের পরিবারকে দেওয়ার আদেশও দেওয়া হয়।

দণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি হলো—সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।

সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়। গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে ওই মাদ্রাসার কেন্দ্রে যান নুসরাত। এসময় তাকে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যায়। এই ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।