নাসিরনগরে হামলার তিন বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

নাসিরনগরে হামলা (ফাইল ছবি)

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামলার ঘটনার তিন বছর পূর্ণ হলো আজ ৩০ অক্টোবর। ২০১৬ সালের এই দিনে ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগে নাসিরনগর উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক বাড়িঘর, মন্দির ভেঙে লুটপাট করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার পর ৮টি মামলা হয়, তবে গত তিন বছরেও সেসব মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে দ্রুততম সময়ে মামলার তদন্ত শেষ হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের এক যুবকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ছবি পোস্ট করা হয়। ২৯ অক্টোবর বিকালে স্থানীয়রা তাকে ধরে মারধরের পর পুলিশে দেয়। এ সময় ফেসবুক থেকে পোস্টটি ডিলিট করে ক্ষমাও চওয়া হয়। এরপর খবর ছড়িয়ে পড়লে ৩০ অক্টোবর সকাল থেকে নাসিরনগর উপজেলা সদরের কলেজ মোড় এবং খেলার মাঠে একাধিক ইসলামি দলের নেতারা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। সমাবেশ চলাকালে হঠাৎ কয়েকশ’ লোক সংঘবদ্ধ হয়ে উপজেলা সদরের হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক পরিবার এবং মন্দিরে হামলা চালায়। ৪ নভেম্বর আবারও নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলা চালানো হয়।

সেদিনের দুঃসহ স্মৃতির কথা মনে করে গাংকুলপাড়ার পূর্ণিমা দাস বলেন, ‘কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার ঘরে ভাঙচুর-লুটপাট করা হয়। সেই দুঃসহ ঘটনায় আমার স্বামী হতভম্ব হয়ে স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল। কিছুদিন আগে আমার স্বামী মারাও গেছে।’

হরিপুর গ্রামের আরতি দাস বলেন, ‘আমরা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি—যারা হামলা করেছিল তাদের যেন তিনি জ্ঞানদান করেন। এমন হামলার ঘটনা আর দেখতে চাই না।’

নাসিরনগরে হামলা (ফাইল ছবি)

নাসিরনগর সদরের পরিমল, অনাথ, সুবল দাস জানান, হামলার ঘটনা নিয়ে তারা আর কিছু শুনতে বা বলতে আগ্রহী নয়। তাদের ভাষ্য, কী হবে বলে বা লিখে। কোনও বিচার হবে না জানি। এখন আপনাদের (সাংবাদিক) সঙ্গে কথা বললে নতুন করে আরেক ঝামেলায় পড়তে হবে। তাদের (আসামিদের) রোষানলে পড়তে হবে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিমল বলেন, ‘মামলা হয়েছে ৮টি। শুনেছি, গৌর মন্দির ভাঙার মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর হদিস নেই। কয়েকজন আসামি কয়েকদিন জেল খেটেছে। সবাই এখন জামিনে মুক্ত। তো এসব বলে আর লাভ কী! গত তিন বছরে অনেক কিছু বদলেছে। মন্ত্রী যাওয়ার পর এমপি হয়েছে। এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাই না।’

হামলার দিন উপজেলা সদরের স্থানীয় মুসলিম যুবকেরা দলবদ্ধভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর রক্ষা করতে এসেছিলেন। তাদের একজন স্কুলশিক্ষক আব্দুল মজিদ। তিনি বলেন, ‘নাসিরনগরের সেই দিনের হামলা ছিল পরিকল্পিত। ওই দিন আমরা কলেজ মোড়ে একটি ক্লিনিকে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সেখান থেকে কিছুটা দূরে নাসিরনগরের সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের দত্তবাড়ি। হঠাৎ দেখি লাঠিসোঁটা নিয়ে একটি মিছিল দত্তবাড়ির দিকে যাচ্ছে। মিছিলকারীরা উত্তেজিত। এরমধ্যে একজন এসে বললো দত্তবাড়িতে হামলা চালাচ্ছে মিছিলকারীরা। এ সময় আমার বন্ধু জামাল, জোবায়ের, চৌধুরী সুমন, উজ্জলসহ কয়েকজন সেখানে ছুটে যাই। ততক্ষণে ওই বাড়ির কালীমন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলে মিছিলকারীরা। পরে বন্ধুদের নিয়ে মানববন্ধন তৈরি করে বাড়িটি রক্ষা করি। তবে হামলাকারীদের হাতে আহত হই আমরা।’

নাসিরনগরে হামলা (ফাইল ছবি)

তিনি আরও বলেন, ‘ওই দিনটি নাসিরনগরের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। আমরা চাই প্রত্যেক আসামির বিচার হোক। তবে কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হয়।’

একই কথা বলেন জামাল, চৌধুরী সুমনসহ কয়েকজন। তারা জানান, বিচার না হলে ভোলার মতো আরও ঘটনা ঘটতে থাকবে।

এদিকে, সরেজমিন হরিপুর গ্রামে রসরাজ দাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিল থেকে মাছ শিকার করে বাড়িতে এসে তিনি দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। তিনি জানান, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মামলায় তাকে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বিলে মাছ ধরে যা পাই, আদালতে আসা-যাওয়া করতে গিয়ে সব শেষ হয়ে যায়। অন্যায় না করেও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে পুলিশের মামলার আসামি আমি। এ মামলার কোনও কূলকিনারা হচ্ছে না।’ এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

পুলিশ জানায়, নাসিরনগরে হামলার ঘটনার পর থানায় মোট ৮টি মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু গত তিন বছরে গৌর মন্দিরে হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত চার্জশিট ছাড়া বাকি মামলাগুলোর তদন্ত এখনও শেষ হয়নি।

এ ব্যাপারে জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি এবং হিন্দু বৌদ্ধ খিস্ট্রান ঐক্য পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোমেশ রঞ্জন রায় বলেন, ‘ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া হামলার ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা। বিচারহীনতা চলতে থাকলে একসময় এ দায় সরকারকেই নিতে হবে। একসময় সরকারকেও বিপাকে পড়তে হতে পারে। তাই সব ঘটনার পেছনের তথ্য সামনে আনা উচিত। জড়িতদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। অন্যথায় এমন ঘটনা ঘটতে থাকবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘নাসিরনগর এখন শান্ত। সবাই মিলেমিশে আগের মতো বসবাস করছে।’ মামলাগুলোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মামলাগুলোর তদন্ত শেষ পর্যায়ে। কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য মামলাগুলো যাচাই করা হচ্ছে। একটু দেরি হচ্ছে। দ্রুত মামলাগুলোর চার্জশিট দেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, নাসিরনগরের ঘটনায় ৮টি মামলায় ১২৬ জনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। তবে তারা সবাই জামিন পান।