খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ নিয়ন্ত্রণাধীন বাজার ফান্ড অফিস সূত্রে জানা যায়, স্থানীয়রা তাদের প্রয়োজনে ১৯৮০ সালে খুব ছোট পরিসরে বাজারটি গড়ে তোলে। স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় ১৯৮৮ সালে বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষ ১ দশমিক ২০ একর জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি মানিকছড়ি রাজপরিবার আরও ১ একর জমি দান করলে সর্বমোট ২ দশমিক ২০ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠে জেলার সবচেয়ে বড় শাকসবজির বাজারটি।
বাজারটিতে ১৫৫টি দোকান রয়েছে। প্রতি বছর দোকানগুলো (১ জুলাই থেকে পরের বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত) ইজারা দেয় বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষ। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে নামমাত্র ৭ লাখ টাকায় বাজারটি ইজারা নেয় মানিকছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা। মূল ইজারাদারের উপস্থিতি বাজারে দেখা না গেলেও সাব-ইজারাদারদের দাপটে অস্থির বাজারে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা। জেলা পরিষদ নির্ধারিত ট্যাক্স-টোলের চেয়ে প্রতিটি পণ্যে, পণ্যবাহী প্রতিটি ট্রাক থেকে বেশি ট্যাক্স-টোল নিচ্ছেন সাব-ইজারাদাররা।
বাজারটি খাগড়াছড়ি সীমান্ত তথা চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি সংলগ্ন হওয়ায় উৎপাদিত শাকসবজির বেশিরভাগই চট্টগ্রামে চলে যায়। প্রায় ৫০০ কৃষক দৈনন্দিন ৪০-৫০ ট্রাক সবজি, যার বাজার মূল্য এক থেকে দেড় কোটি টাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছে। বছরের বিভিন্ন মৌসুমি ফলের সময়েও সরগরম থাকে বাজারটি। কিন্তু সব শাকসবজি বিক্রি হয় খোলা আকাশের নিচে। শাকসবজি নিতে আসা বা অপেক্ষমাণ ট্রাকের কারণে যানজট সৃষ্টি হয় খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। বাজারে সব মিলিয়ে দুই শতাধিক স্থায়ী-অস্থায়ী দোকানপাট থাকলেও সমস্যার বেড়াজালে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
চট্টগ্রাম থেকে আসা পাইকার মো. সুমন বলেন, তিনটহরী বাজার থেকে তরতাজা ও ফরমালিনমুক্ত শাকসবজি অল্প দামে যেমন ক্রয় করা যায়, তেমনি পরিবহনেও সুবিধা। বিক্রি করেও লাভবান হন তারা। কিন্তু এই বাজারে কৃষক-ব্যবসায়ীদের বসার, থাকার বা খাবারের কোনও সুবিধা নেই। বাজারের ড্রেনেজ-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ নেই, পাবলিক টয়লেট-পাবলিক গোসলখানা নেই, আবাসিক বা খাবারের কোনও হোটেল নেই। পণ্য নিতে আসা পরিবহনগুলোর দাঁড়ানোর জায়গা নেই। বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি শুধু নিজেদের পকেট ভারী করলেও ব্যবসায়ী বা কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয় না। এসব বিষয় না দেখলে বাজারটি কৃষক ও ব্যবসায়ী সবই হারাবে।
বাজারে কৃষক জামাল হোসেন বলেন, তিনটহরী বাজারে খুব ভোরে পাইকারেরা চলে আসে। পাইকার বেশি আসায় কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত কৃষিজ কাঁচামাল ভালো দামে এবং অল্প সময়ে বিক্রয় করতে পারেন। কিন্তু চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের এবং উপজেলার শতাধিক গ্রাম থেকে আসা কৃষকদের জন্য বাজারে লেট্রিন করার, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার, বসার বা নাশতা করার যুগোপযোগী কোনও ব্যবস্থা করেনি বাজার পরিচালনা কমিটি। তাছাড়া পুরো বাজার খানাখন্দকে ভরা। বর্ষাকালে কৃষক, ব্যবসায়ী বা বাজারের দোকানদারদের ভোগান্তির শেষ থাকে না।
মানিকছড়ি উপজেলার ডাইনছড়ি এলাকার কৃষক আবদুল করিম জানান, গত চার দশক ধরে তারা সবজি উৎপাদন ও রফতানির সঙ্গে জড়িত। তাদের (কৃষকদের) ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও বাজারের কোনও পরিবর্তন হয়নি। উল্টো নানা কারণে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে বাজারটি। সরকারি দলের লোকজন প্লট দখল, ক্রয়-বিক্রয়, ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে অতিরিক্ত ইজারা আদায়ের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে ব্যস্ত থাকলেও বাজারের উন্নয়নে তাদের ভূমিকা নেই। তিনি দ্রুত বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
তিনটহরী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন গড়ে এক-দেড় কোটি টাকার লেনদেন হলেও শান্তিতে নেই ব্যবসায়ীরা। কারণ, বাজারটিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই, সবজি শেড নেই, বিশ্রামাগার নেই, ভালো থাকার বা খাবার হোটেল নেই। গলিগুলোও পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। পুরো বাজার খানাখন্দক ভরা থাকায় সব মৌসুমেই ভোগান্তিতে থাকে বাজারের ব্যবসায়ীরাসহ বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীরা। তিনি এসব সমস্যা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন।
বাজার ফান্ডের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, জেলার সবচেয়ে বড় কাঁচাবাজারটির নানা সমস্যা সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। ইজারার সব অর্থ বাজার ফান্ড পায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইজারার ৩৫ শতাংশ টাকা পায় তিনটহরী ইউনিয়ন পরিষদ, ১০ শতাংশ পায় রাজ চৌধুরী এবং ১ শতাংশ ভূমি কর হিসেবে দিতে হয়। সব মিলিয়ে ৪৬ শতাংশ টাকা অন্যরা নেওয়ার পর বাকি ৫৪ শতাংশ টাকা বাজার ফান্ড পায়। এই টাকা দিয়ে ফান্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানো হয়। শুধু ইজারার টাকা দিয়ে বাজারের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রত্যেকটি বাজারের উন্নয়নের জন্য মাস্টারপ্ল্যান করছে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী কৃষক, নারী কৃষক, ব্যবসায়ী, স্থায়ী দোকানদারদের চাহিদা মোতাবেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পাদন করা হবে।