কক্সবাজার সৈকতের ৬ ঘোড়ার মৃত্যু

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঘোড়া মালিকদের দুর্দিন চলছে। করোনা সংক্রমণরোধে বিধিনিষেধে সৈকতে পর্যটক নিষিদ্ধ থাকায় আয়-রোজগারের সংকটে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মালিকদের পক্ষে ঘোড়াগুলোকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চলতি বছর মারা গেছে ছয়টি ঘোড়া। অবশ্য, এসব ঘোড়ার বেশিরভাগ রোগে ও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কক্সবাজার সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের বিনোদন দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ৫৫টি ঘোড়া ব্যবহার হয়ে আসছে। ঘোড়া মালিকদের ২২ জন সদস্য বিশিষ্ট ‘কক্সবাজার ঘোড়া মালিক সমিতি’ নামের সমিতি রয়েছে। সমিতির বাইরে আরও ১০টিসহ ৬৫টি ঘোড়া রয়েছে। এসব ঘোড়ার পিঠে চড়ে, ছবি তুলে নানাভাবে বিনোদন উপভোগ করেন পর্যটকরা।

এর বাইরে ঘোড়ার গাড়ি, বিয়ে ও বিভিন্ন উৎসবে ঘোড়াগুলোর ব্যবহার হয়। যার বিনিময়ে ঘোড়া মালিকরা পান অর্থ। এসব অর্থ নিজেদের সংসারের পাশাপাশি ঘোড়াগুলো লালন-পালনে ব্যয় করেন। কিন্তু চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকাতে লকডাউন ঘোষণা করে সৈকতসহ বিনোদনকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। যার কারণে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ে কক্সবাজার। ফলে অন্যান্য পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতো বেকায়দায় পড়েন ঘোড়া মালিকরা।

খাবারের অভাবে মারা যায় তিনটি ঘোড়া

নিজেদের সংসারে অভাবের পাশাপাশি ঘোড়ার খাদ্য সংকটে পড়েন। ঘোড়া মালিকদের অসহায়ত্ব দেখে কক্সবাজার সদর উপজেলা প্রশাসন ২০০ বস্তা ভুষি বিতরণ করে। এতে ঘোড়া মালিকদের কিছুটা অর্থ লাঘব হলেও সংকট পিছু ছাড়েনি। এরই মধ্যে খাবারের অভাবে মারা যায় তিনটি ঘোড়া। এছাড়া কুকুরের কামড়ে অসুস্থ হয়ে দুটি এবং সড়ক দুর্ঘটনায় একটি ঘোড়া মারা যায়।

কক্সবাজার ঘোড়া মালিক সমিতির সভাপতি আহসান উদ্দিন নিশান বলেন, লকডাউনে ঘোড়া মালিকরা খুবই বেকায়দায় রয়েছেন। খাদ্যের অভাব ও নানা কারণে চলতি বছর ছয়টি ঘোড়া মারা গেছে। এর মধ্যে কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়া এলাকার আমির হোসেনের একটি, মোহাম্মদ আলমের একটি ও আকতার হোসেনের একটি ঘোড়া খাবারের অভাবে মারা গেছে। এছাড়া শহরের পেশকারপাড়া এলাকার মোহাম্মদ কাদেরের দুটি ঘোড়া অসুস্থ হয়ে এবং রুবেলের একটি ঘোড়া জেলগেট এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।

আহসান উদ্দিন নিশানের ভাষ্যমতে, প্রতিটি ঘোড়ার মূল্য ৪৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। মারা যাওয়ার পেছনে খাদ্য সংকটসহ নানা কারণ রয়েছে। খাদ্য সংকটে পড়ে কিছু মালিক ঘোড়া শহরে ছেড়ে দিয়েছেন। যার কারণে এসব ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছে।

কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার ঘোড়া মালিক আব্দুল মজিদ লিটন বলেন, আমার ছয়টি ঘোড়া রয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে সৈকতে পর্যটক নিষিদ্ধ করার পর চরম খাদ্য সংকটে পড়ে ঘোড়াগুলো। আমার মতো অন্যান্য ঘোড়া মালিকরাও একই অবস্থায় পড়েন। ফলে সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাকে ১৫ বস্তা ভুষি দেয়। কিন্তু ১৫ বস্তা ১৫ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। অবশ্য আমার ঘোড়াগুলো এখন সুস্থ আছে।

অসুস্থ হয়ে দুটি ঘোড়ার মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে কক্সবাজার শহরের পেশকারপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আমার আটটি ঘোড়া। এর মধ্যে দুটি ঘোড়া মারা গেছে। আমার মনে হচ্ছে খাদ্যের অভাবে মারা গেছে ঘোড়াগুলো। আরও দুটি ঘোড়া অসুস্থ। প্রতিদিন একটি ঘোড়ার ২০০-৩০০ টাকার খাদ্য লাগে। কিন্তু এ সময়ে আয়-রোজগার না থাকায় আমাদের পরিবারে দুর্দিন চলছে। আমরা লকডাউনে সরকারের সহযোগিতা চাই।

খাদ্য সংকটে পড়ে কিছু মালিক ঘোড়া শহরে ছেড়ে দিয়েছেন

সমিতিপাড়ার বাসিন্দা ও ঘোড়ার মালিক মোহাম্মদ আলম বলেন, আমার একটি ঘোড়া মারা গেছে। লকডাউনে খাদ্য সংকটে পড়ে অসুস্থ হয়ে ঘোড়াটি মারা যায়। তবে আমার জানামতে গত এক মাসে তিনটি ঘোড়া এভাবে মারা গেছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের (পর্যটন ও প্রটোকল) সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, সৈকতে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য ২২ জন ঘোড়া মালিককে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে করোনার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে সৈকত ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ঘোড়া মালিকদের আয় বন্ধ এবং ঘোড়াগুলো খাদ্য সংকটে পড়ে। এজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভুষি ও ছোলা বিতরণ করা হয়। খাদ্য সংকট থাকার কথা নয়।

কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা ডা. অসিম বরণ সেন বলেন, খাদ্যের অভাবে ঘোড়া মারা যাওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। এটি মিথ্যা কথা। এক বছরে তিনটি ঘোড়া মারা গেছে। তাও বার্ধক্যজনিত ও নানা অসুস্থতার কারণে। খাদ্যের অভাবে এত ঘোড়া মারা যাওয়ার খবর সঠিক নয়। কারণ আমরা ঘোড়া মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের ঘোড়াগুলোকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছি। আগামীতেও এ সহায়তা অব্যাহত থাকবে।