ধর্ষণের সালিশ থানায়, অভিযুক্তকে এক লাখ ৪০ হাজারে মুক্তি

বিয়ের আশ্বাসে ধর্ষণের ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর থানায় সালিশ বসিয়ে টাকার বিনিময়ে মীমাংসা করা হয়েছে। জানা গেছে, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ অভিযুক্ত যুবককে বাড়ি থেকে আটক করে থানায় এনে সালিশে বসে। এক লাখ ৪০ হাজার টাকায় ঘটনাটি মীমাংসা করা হয়। তা থেকে ভুক্তভোগী তরুণীকে দেওয়া হয় ৮০ হাজার টাকা। বাকি ৬০ হাজার টাকা রাখা হয় সালিশের খরচ বাবদ। শনিবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কুমিল্লার মুরাদনগর থানায় এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। 

এ ঘটনায় অভিযুক্ত শাহিন (২৫) উপজেলার সদর ইউনিয়নের ইউসুফনগর গ্রামের নূরু মিয়ার ছেলে। ভুক্তভোগী তরুণী (১৯) জেলা সদরের বাসিন্দা।

থানায় অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত শাহিন প্রবাসে থাকাকালে মোবাইল ফোনে ওই তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত ১৭ আগস্ট শাহিন দেশে আসেন। এসে একমাসের মধ্যে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই যুবতীকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়ে রাত্রিযাপন করেন এবং তাদের শারীরিক সম্পর্কও হয়। পরে অনেকটা গোপনীয়তা বজায় রেখে ২৮ সেপ্টেম্বর শাহিন অন্যত্র বিয়ে করে ফেলেন। এ খবরে ওই তরুণী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে পরিবার ও স্বজনদের সহযোগিতায় তিনি আত্মহত্যা থেকে সরে আসেন। ২ অক্টোবর সকালে তিনি বিয়ের আশ্বাসে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মুরাদনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে অভিযুক্ত শাহিনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। কিন্তু গ্রেফতারের পাঁচ ঘণ্টা পরেই থানায় বসে সালিশ। এক লাখ ৪০ হাজার টাকায় মীমাংসা হয়। ভুক্তভোগীকে দেওয়া হয় ৮০ হাজার টাকা। বাকি ৬০ হাজার টাকা সালিশ খরচ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শাহিন হাসিমুখে বাড়ি গেলেও ভুক্তভোগি যুবতী গেলেন চাপা ক্ষোভ নিয়ে।

অভিযুক্ত শাহিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার বোন বলেন, ‘অভিযোগকারীকে যেকোনও কারণে আমার ভাই বিয়ে করেনি। তাই সে থানায় অভিযোগ করেছে। ফলে শনিবার (২ অক্টোবর) দুপুরে পুলিশ আমার ভাইকে থানায় ধরে নিয়ে যায়। থানায় বৈঠকে প্রথমে এক লাখ ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পরে আরও ৩০ হাজার টাকা নেন বড় স্যার। টাকা নেওয়ার সময় তিনি বলেছেন, ৮০ হাজার টাকা দিয়ে ওই নারীকে বিদায় করতে হবে, বাকি ৬০ হাজার টাকা থানার খরচ।’

ইউসুফনগর গ্রামের আবুল কালাম আজাদ মাস্টার বলেন, ‘আমি থানার সালিশে উপস্থিত ছিলাম, তবে বিচার আমি করিনি। দু’পক্ষের উপস্থিতিতে থানায় বসে সালিশ শেষে এক ঘণ্টার মধ্যে মেয়েকে ৮০ হাজার টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি আর কিছু জানি না।’

ভুক্তভোগী তরুণী বলেন, ‘অভিযোগ দেওয়ার পর থানায় আমাকে নিয়ে সালিশ বসে। আমি ৮০ হাজার টাকা পেয়েছি। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।’

অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসআই নূর-আজম বলেন, ‘ওই তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে শাহিনকে থানায় নিয়ে আসি। দু’পক্ষের অনুমতিতেই ওসি স্যারের নির্দেশে সালিশ করা হয়। আর সালিশে মেয়েকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।’

মুরাদনগর থানার ওসি সাদেকুর রহমান সালিশের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমার অনুমতি নিয়েই এএসআই নূর-আজম এই সালিশটি করেছেন। আমার জানা মতে, মেয়েটিকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত ছেলের পরিবারের কাছ থেকে এই টাকা নেওয়া হয়েছে। আমি কুমিল্লায় আছি, রাতে এসে বিস্তারিত জেনে বলতে পারবো।’

সালিশের বৈধতার বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট (সাবেক এপিপি) সৈয়দ তানভীর আহমেদ ফয়সাল বলেন, ‘ধর্ষণের অভিযোগ থানায় কেন, অন্য কোথাও বসেও আপস-মীমাংসা করা যাবে না। এ ঘটনা মীমাংসা আইন অবমাননার শামিল। কেননা এ অভিযোগে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারায় তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।’