রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে চালানো বিশেষ অভিযানে ১১৪ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীসহ ১৭২ জনকে গ্রেফতার করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)।
১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নাইমুল হক সোমবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীসহ ১৭২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্যাম্পগুলোতে ‘ব্লক রেইড’ অভিযান চলছে। কাউকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না। আমাদের দেশে দুর্বৃত্তদের স্থান নেই।
সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড ও অস্থিরতার জন্য নিহতের স্বজনরা আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে (আরসা) দায়ী করলেও সরকারি মুখপাত্ররা বলে আসছেন, দেশে আরসার অস্তিত্ব নেই।
এ বিষয়ে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) মুখপাত্র রশিদ উল্লাহ বলেন, ক্যাম্পগুলোতে আরসার অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি সরকার এখনও বিশ্বাস না করায় আমরা হতাশ। এই অবিশ্বাসের কারণে একের পর হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
মুহিবুল্লাহ এবং বালুখালীর ‘দারুল উলুম নাদওয়াতুল ওলামা আল-ইসলামিয়াহ’ মাদ্রাসায় আরও ছয় জনকে হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে আরসা সক্রিয় উল্লেখ করে রশিদ বলেন, ক্যাম্পে পুলিশের তৎপরতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা খুশি।
এপিবিএন জানায়, গত এক মাসে মাদক ব্যবসা, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকায় আরও ৫৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, চার রাউন্ড কার্তুজ, দুই রাউন্ড রাইফেলের গুলি ও ১৪টি রামদা উদ্ধার করা হয়। ১১ হাজার ২৯৪ পিস ইয়াবা, ৪০ গ্রাম গাঁজা, অবৈধভাবে মজুত করা ৬০০ কেজি চাল ও ৮৯ লিটার তেল জব্দ করা হয়।
নাইমুল হক বলেন, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পাঁচটি, ডাকাতির প্রস্তুতি সংক্রান্ত পাঁচটি, মাদকের ১৩টিসহ ২৫টি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্পে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ৫৯টি মামলা ও ৫৩ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মো. রফিক বলেন, সন্ত্রাসীরা এখনও গভীর রাতে এসে ক্যাম্পের লোকজনকে ভয়ভীতি দেখায়। যে কারণে রোহিঙ্গাদের আতঙ্ক কাটছে না।
আমার ক্যাম্পে ছয় জন নিহত হওয়ার পর লোকজন রাতে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, অনেকে অন্য ক্যাম্পে অবস্থানকারী স্বজনদের কাছে চলে গেছেন। মুহিবুল্লাহর স্ত্রী-সন্তানসহ ১৭টি পরিবারের ৭৩ সদস্যকে ইতোমধ্যে ক্যাম্প থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে দাবি করে বাংলাদেশি মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলেন, বর্তমানে রোহিঙ্গাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা ও ভয় বিরাজমান।
মুহিবুল্লাহ হত্যার ঘটনায় তার ছোট ভাই হাবিব উল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাত ২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মাদ্রাসায় নিহত আজিজুল হকের বাবা নুরুল ইসলাম ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২৫০ জনের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় মামলা করেন।
দুই মামলায় ২৪ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে মুহিবুল্লাহ হত্যায় ১০ জনকে গ্রেফতারের কথা জানান নাইমুল হক। তিনি বলেন, তাদের মধ্যে তিন জন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গতি আনতে তিনটি নতুন পুলিশ ক্যাম্প ভবন স্থাপন করে দিচ্ছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)। এসপি নাইমুলের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলো লম্বাশিয়া, নৌকার মাঠ ও অক্সফামে (ক্যাম্প-৪) স্থাপন করা হবে।
এর মধ্যে লম্বাশিয়া ও নৌকার মাঠ পুলিশ ক্যাম্পের নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে উল্লেখ করে এসপি নাইমুল বলেন, ক্যাম্প ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হলে কর্তব্যরত পুলিশের আবাসন সমস্যার সমাধান হবে।