এক উপজেলায় নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী ৪৮ বিদ্রোহী প্রার্থী

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ১৫ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ৪৮ জন। তাদের অধিকাংশই উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পদে রয়েছেন। এ নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) সপ্তম ধাপের ইউপি নির্বাচনে এই ১৫ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

তৃণমূলের ১০ জন নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, দেবিদ্বার উপজেলায় আওয়ামী লীগের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। এক গ্রুপের নেতাকর্মীর সঙ্গে অন্য গ্রুপের নেতাকর্মীর মিল নেই। গ্রুপের আধিপত্য ধরে রাখতে ১৫ ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। এজন্য নৌকার প্রার্থীদের অবস্থা নড়বড়ে। বিদ্রোহীদের কারণে হারতে পারেন নৌকার প্রার্থীরা।

নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেবিদ্বারের ১৫ ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক চেয়েছেন প্রায় ১০০ জন। এর মধ্যে ১৫ জনকে মনোনয়ন দিয়েছে দল। এ অবস্থায় অধিকাংশ নেতা নৌকাকে সমর্থন দিয়ে সরে গেলেও কোন্দলের কারণে ৪৮ জন বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বড়কামতা ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক পেয়েছেন বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের বাবা নুরুল ইসলাম। এখানে নৌকার মাঠ অন্যসব ইউনিয়নের চেয়েও ভালো। এই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে চশমা প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন মো. মাহবুব আলম ভূঁইয়া, মোটরসাইকেল প্রতীকে লুতফুর রহমান ও ঘোড়া প্রতীকে হারুনুর রশিদ।

গুণাইঘর দক্ষিণ ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রৌশন আলী মাস্টারের ভাই ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির। সেখানে বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে আছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আবদুল হাকিম খান।

ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন প্রার্থী ও সমর্থকরাজাফরগঞ্জে নৌকা পেয়েছেন আনোয়ার হোসেন। তার বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আনারস প্রতীকে জাহিদুল আলম, ঘোড়া প্রতীকে মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও সোহরাব হোসেন। তারা প্রত্যেকেই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আবার কেউ শীর্ষ পদধারী।

সুলতানপুর ইউনিয়নে নৌকা পাওয়া হুমায়ুন কবিরের প্রধান বাধা মোটরসাইকেল প্রতীকের বিদ্রোহী প্রার্থী শফিকুল ইসলাম ও আনারসের জসিম উদ্দীন। মোহনপুরে নৌকাকে ঠেকাতে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন পাঁচ জন। তারা হলেন টেলিফোন প্রতীকে আবদুল গফুর, ঘোড়া প্রতীকে শাহ আলম, আনারস প্রতীকে তাজুল ইসলাম, মোটরসাইকেল প্রতীকে ময়নাল হোসেন ও চশমার রাশেদ খান।

রাজামোহরে নৌকা পেয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী তিন জন। ঘোড়া প্রতীকে ইকবাল হোসেন শিকদার, চশমা প্রতীকে জসিম উদ্দীন সরকার ও আনারসের জাহাঙ্গীর আলম সরকার। গুণাইঘর উত্তর ইউনিয়নে নৌকার বিপক্ষে মাঠে রয়েছেন দুই বারের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আনারস প্রতীকের বিদ্রোহী প্রার্থী খোরশেদ আলম। এছাড়া বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ঘোড়া প্রতীকের আলী আজ্জম সরকার। এই ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছেন মো. মোকবল হোসেন।

রসুলপুর ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছেন কারুল হাসান। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন পাঁচ জন। আনারসের মাহাবুব আলম, চশমা প্রতীকের নুরুল আলম, টেলিফোন নিয়ে মুর্শিদ আলম সরকার, মোটরসাইকেল প্রতীকে মো. মোমেন, ঘোড়া প্রতীকে মোহাম্মদ শাহজাহান। ধামতীতে মো. জসিম নৌকা পেলেও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আনারস প্রতীকের মহিউদ্দিন মিঠু ও চশমা প্রতীকে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

সুবিল ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছেন নজরুল ইসলাম সরকার। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন চশমা প্রতীকে গোলাম সরোয়ার, আনারস প্রতীকে আবু তাহের সরকার ও ঘোড়া প্রতীকে শাহেরা বেগম।

ফাতেহাবাদ ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছেন থানা মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহানাজ পারভীন। তার বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ঢোল প্রতীকে মফিজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক দোয়াত-কলম প্রতীকে কামরুজ্জামান মাসুদ, টেবিল ফ্যান প্রতীকে আলেক মিয়া, আনারস প্রতীকে খন্দকার এম এ ছালাম, রজনীগন্ধা প্রতীকে ছাদ্দাম হোসেন, চশমা প্রতীকে জাহিস হাসান, টেলিফোন প্রতীকে এরশাদ মিয়া ও অটোরিকশা প্রতীকে সাম মিয়া।

ইউসুফপুর ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছেন ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি কবির হোসেন। তার বিপক্ষে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ঘোড়া প্রতীকে মাজহারুল ইসলাম ও সাবেক চেয়ারম্যান চশমা প্রতীকে শফিকুল ইসলাম।

এলাহাবাদে নৌকা পেয়েছেন পাঁচ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম সরকার, তার ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী তিন জন। তারা হলেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য চশমা প্রতীকে নুরুল আমিন, আনারস প্রতীকে জাকির হোসেন ও ঘোড়া প্রতীকে দুলাল হোসেন।

বড়শালঘরে নৌকার মাঝি ইউনুস মিয়া। তার প্রতিদ্বন্দ্বী  তিন বিদ্রোহী প্রার্থী। আনারস প্রতীকে আবদুল আউয়াল, চশমা প্রতীকে জহিরুল ইসলাম ও ঘোড়া প্রতীকে মমিনুল ইসলাম সরকার।

ভানী ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক পেয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নুরুজ্জামান। তার ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী তিন জন। তারা হলেন উত্তর জেলা কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ঘোড়া প্রতীকে হানিফ খান, মোটরসাইকেল প্রতীকে জালাল উদ্দীন ভূঁইয়া ও চশমা প্রতীকে মো. গোফরান।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, বিদ্রোহীদের প্রত্যেকে আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের পদে আছেন। কেউ স্থানীয় এমপির ইন্দনে আবার কেউ উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের ইন্দনে কেউবা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

ফতেহাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও নৌকা প্রতীকের বিদ্রোহী প্রার্থী মফিজুল ইসলাম বলেন, আমি ২৪ বছর রাজনীতি করি। দুই বার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ছিলাম ও বর্তমান সভাপতি। আমাকে না দিয়ে নৌকা দিয়েছে থানা মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রীকে। যার কোনও পরিচিতি নেই। এজন্য বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছি।

ফতেহাবাদ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুজ্জামান মাসুদ বলেন, আমি ২৭ বছর রাজনীতি করি। এই ২৭ বছরে ৩৮ মামলা খেয়েছি শুধুই দলের জন্য। আমি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আমাকে কেন দল নৌকা দিলো না? তাই আমি নির্বাচন করছি। আমার সঙ্গে জনগণ আছে।

গুণাইঘর উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হাকিম খান বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে বলেন, আমি বর্তমান চেয়ারম্যান। আমি দলের লোক। আমরা পদবি চাই না। অথচ এবারের ইউপি নির্বাচনে আমার নামের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়নি। তাই আমি নির্বাচন করছি।

ইউসুফপুর ইউনিয়নে নৌকার বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া থানা আওয়ামী সদস্য কবির হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ এখন মনে হয় ঘরের জিনিস। যাকে তাকে নৌকা দিয়ে বসে। আমি সাবেক চেয়ারম্যান। জনগণ আমাকে চায়। তাই আমি নির্বাচন করছি।

দেবিদ্বার উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নৌকার প্রার্থীদের নাম কেন্দ্রে দিয়েছেন জেলা পর্যায়ের নেতারা। উনাদের যাছাই-বাছাইয়ে ভুল হতে পারে। যার কারণে ত্যাগী নেতারা নির্বাচন করছেন। তাই বিদ্রোহী প্রার্থী বেশি।

নেতাকর্মীদের গ্রুপিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু দলের নেত্রী ছাড়া সারাদেশে গ্রুপিং আছে। এখানেও আছে। আমরা মনে করি, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দল একটা শক্ত ব্যবস্থা নেবে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রৌশন আলী মাস্টার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, তালিকা করে রাখতে। নির্বাচনের পর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেবে না কেন্দ্র। এর আগেও বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় অনেক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।