৪০ বছর ধরে মহিষের শিং দিয়ে গহনা বানান জীবন চাকমা

যুগ যুগ ধরে খাগড়াছড়িতে মহিষের শিং দিয়ে বানানো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গহনা। পাহাড়ি অঞ্চলের নারীদের কাছে এসব গহনার ব্যাপক কদর রয়েছে। এসব গহনা অনেকের প্রিয়।

দীঘিনালার বোয়ালখালী এলাকার নিজ বাড়িতে ৪০ বছর ধরে মহিষের শিং দিয়ে বাহারি গহনা বানাচ্ছেন পূর্ণ জীবন চাকমা। সনাতনী পদ্ধতিতে মহিষের শিং থেকে হস্তচালিত কাঠের যন্ত্র দিয়ে তৈরি করা হয় হাতের চুড়ি, আংটি, কানের দুল ও গলার হার। কক্সবাজার ও বান্দরবান থেকে সংগ্রহ করা হয় মহিষের বড় বড় শিং। পরে এসব শিং কেটে বানানো হয় গহনা। মহিষের শিংয়ের গহনা পাহাড়িদের ঐতিহ্যের ধারক বলে মনে করেন অনেক পাহাড়ি নারী।

খাগড়াছড়ির খাগড়াপুর এলাকার নারী উদ্যোক্তা শাপলা দেবী ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ি নারীদের কাছে প্রিয় মহিষের শিং থেকে তৈরি গহনা। এটি পাহাড়ি নারীদের কাছে ঐতিহ্যের অংশ। আগে অনেক গহনা শিল্পী ছিলেন। তাদের তৈরি গহনা সবাই ব্যবহার করতো।

খাগড়াছড়ি জেলা মহিলা সংস্থার সদস্য সুইচিংথুই মারমা বলেন, মহিষের শিংয়ের গহনা অনেক টেকসই ও মজবুত। ব্যবহারে কোনও ক্ষতি নেই। পাহাড়ি নারীরা একসময় মহিষের শিংয়ের গহনা খুব সহজে পেতেন এবং অল্প দামেই কিনতে পারতেন। কিন্তু এখন দাম বেশি। চুড়ি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, গলার হার এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা, আংটি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় কিনতে হয়।

khagrachari1

দীঘিনালা উপজেলার বোয়ালখালী এলাকার রত্ন চাকমা বলেন, সময়মতো মহিষের শিংয়ের গহনা পাওয়া যায় না। আগে অর্ডার দিয়ে বানাতে হয়। গহনার কারিগরের সংখ্যা যেমন কম, তেমনি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হয় না বলেই কিছুদিন পর সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় বিবর্ণ হয়ে যায়। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, রং ও ডিজাইন ব্যবহার করলে চাহিদা সংকট দূর হবে। সেই সঙ্গে এসব ব্যবহারে আগ্রহ বাড়বে।

গহনা তৈরির সহকারী কারিগর সুমন চাকমা বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে নারীরা মহিষের শিংয়ের গহনার অর্ডার দেন। তবে অনেক সময় শিং সংকটের কারণে কাজ বন্ধ থাকে। কখনও কখনও পুরো মাস কাজ পাই না। তবে গহনা কারিগরের সহকারী হিসেবে মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন বলে জানান সুমন চাকমা।

মহিষের শিং দিয়ে গহনা তৈরির কারিগর পূর্ণ বিকাশ চাকমা বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। আগে আমার পূর্বপুরুষরা এই কাজ করতেন। পূর্বপুরুষদের পেশা ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে এই পেশায় থাকলেও কাঁচামাল সংকটের কারণে চাহিদামতো গহনা বানাতে না পারার আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। 

khagrachari3

এখন সব কিছুরই দাম বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব খরচ মিটিয়ে মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় হয়। অর্ডার অনেক বেশি থাকলেও তা সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। তবে গহনা তৈরিতে আধুনিক মেশিন, ডিজিটাল ডিজাইন ব্যবহার করলে হয়তো চাহিদা পূরণ করা যাবে। তবে আর্থিক সংকটের কারণে তিনি তা করতে পারবেন না বলে জানান। 

খাগড়াছড়ি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক সুদর্শন দত্ত বলেন, যুগ যুগ ধরে স্বর্ণ বা রূপার বিকল্প হিসেবে মহিষের শিং দিয়ে তৈরি গহনা ব্যবহার করে আসছিলেন পাহাড়ি নারীরা। এখন ইমিটেশন গোল্ডের গহনা ব্যবহার করেন তারা। এজন্য মহিষের শিং দিয়ে তৈরি গহনা ব্যবহার কমেছে। যদি কারিগরদের সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া যায় তাহলে এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, মহিষের শিং থেকে অথবা অন্য কোনও সামগ্রী থেকে গহনা তৈরির কারিগরদের সংখ্যা আমরা জানি না। তাদের তালিকা করা হবে। ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে তাদের সরকারি সহায়তা দেওয়া যায় কিনা সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।