চট্টগ্রামে কিছুতেই কমছে না মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। বরং দিন দিন এ রোগে আক্রান্তের হার বেড়েই চলেছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন শত শত রোগী। প্রতিদিনই আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন নতুন রোগী। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন অনেকেই। মৃত্যু ঝুঁকি থাকায় এ রোগে আক্রান্তরা থাকেন চরম আতঙ্কে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিধনের বিকল্প নেই। এজন্য মশার ওষুধ ছিটানোতে গতি বাড়াতে হবে। নালা-নর্দমা, খাল, বাড়ির ছাদসহ বাড়ি-ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) আলাদা বিভাগ খুলেছে। নগর জুড়ে মশা নিধনে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে পৃথক এই বিভাগ খোলা হয়েছে। এ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে। ডেঙ্গু সচেতনতায় লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি মাইকিংও করছে সিটি করপোরেশন। এছাড়া ম্যাজিস্ট্রেটদের সহায়তায় চলছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। বাড়ি ছাদে কিংবা বাড়ি আশপাশে ডেঙ্গু মশার লার্ভা পাওয়া গেলেই জরিমানা করা হচ্ছে ভবন মালিকদের।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে প্রতিদিন নতুন করে ৭০-৮০ জন কিংবা আরও বেশি রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছেন। ডেঙ্গু বাহিত মশা নিধন না হওয়া পর্যন্ত এ রোগ কমবে না। এ কারণে সিটি করপোরেশনকে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে চঠি দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে এই পর্যন্ত আড়াই হাজার লোক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে মারা গেছেন ১৪ জন।’ চট্টগ্রামে আক্রান্তদের মধ্যে ৭০ শতাংশ নগরীর বাসিন্দা বলে জানান তিনি।
এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বৃহস্পতিবার (২৭ অক্টোবর) নগরীর চকবাজার ওয়ার্ডে মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেন।
কর্মসূচির উদ্বোধন করে মেয়র বলেন, ‘চট্টগ্রামে ইতোমধ্যে ডেঙ্গু-চিকনগুনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। এই রোগ প্রতিরোধে নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে। পরিষ্কার ও বদ্ধ পানিতে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র। তাই বাসাবাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, ফুলের টব, অকেজো প্লাস্টিক বোতল, টায়ার, এয়ারকন্ডিশন ও ফ্রিজের নিচের ট্রেতে তিন দিনের বেশি পানি যাতে জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এটা আমাদের সবার নাগরিক দায়িত্ব।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে গত ২০ অক্টোবর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির এক সভা চসিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। চসিকের ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি মো. মোবারক আলীর সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্টিত হয়।
এতে মশা নিধন নিয়ে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরমধ্যে রয়েছে-ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আরবান ও রেডক্রিসেন্ট টিমকে কাজে লাগানো হবে। ডেঙ্গু সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, স্থানীয় ক্যাবল টিভিতে প্রচারণা ও আবাসিক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতদের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বারোপ করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ডেঙ্গুবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে নির্মাণাধীন ভবন ও ছাদবাগানের মালিকদের বাধ্যতামূলক স্প্রে মেশিন রাখা এবং প্রতি তিন দিন পর স্প্রে/ফগিং করার জন্য নির্দেশনা দিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধপত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। সব আবাসিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি/সেক্রেটারি বরাবর চসিক মেয়র স্বাক্ষরিত পত্র পাঠানোর মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রত্যেক সমিতির নিজস্ব করণীয় বিষয়ে পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় দুই হাজার লিটার লার্বিসাইড ও ১৫ হাজার লিটার এডাল্টিসাইড এবং পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের জন্য ১০০ লিটার মসকুবান ও এর জন্য প্রয়োজনীয় ন্যাপথা ক্রয়ের সুপারিশ করা হয়। সপ্তাহব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য প্রতি ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অনুকূলে ১৫ হাজার টাকা ও আবাসিক এলাকায় উঠান বৈঠকের খরচ বাবদ পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়। ডেঙ্গুবিরোধী প্রচারণা জোরদারের লক্ষ্যে নতুন করে দুই লাখ লিফলেট ছাপানোরও সিদ্ধান্ত হয়। মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ও প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তার পরামর্শক্রমে কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারে পর্যাপ্ত এস্কেভেটর/পে-লোডার, ডাম্প ট্রাক সরবরাহের জন্য যান্ত্রিক শাখাকে নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়।
চসিকের ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি মো. মোবারক আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনে ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সচেতনতায় লিফলেট ও মাইকিং করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চলছে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান।’
তবে মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমকে কেতাবি কারবার বলে মনে করছেন নগরীর বাসিন্দারা। নগরীর ৪ নম্বর মহড়া ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও সংবাদকর্মী মো. রিপন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত এক বছরের মধ্যে আমার এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাতে সিটি করপোরেশনের কোনও কর্মীকে দেখা যায়নি। এমনকি ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমে জড়িত কর্মীদেরও এই এলাকায় আসতে দেখিনি। অথচ আমার এলাকায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াসহ অন্যান্য রোগ বেড়েছে। অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন। বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর গৃহকর বাড়িয়েছেন কয়েকগুণ। নিয়মিত গৃহকর দিয়েও ন্যুনতম নাগরিক সুবিধা না পাওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া যায় না।
এদিকে সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশন ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে দেখে আসছি অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও নভেম্বরের মধ্যখানে গিয়ে কমে যায়। তবে এবার কমার কোনও লক্ষণ নেই। এখনও বিআইটিআইডি হাসপাতালে ৩০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিদিনই ৮-১০ জন করে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছেন। মশার উপদ্রুব না কমা পর্যন্ত ডেঙ্গু কমবে না। আগে যে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতো তাদের চেয়ে এখনের রোগীদের অবস্থা বেশ জটিল থাকে। এখনাকার বেশিরভাগ রোগীর প্রেসার কম থাকে, নাক দিয়ে রক্ত পড়ে, অনেক রোগীর প্লাটিলেট (অনুচক্রিকা) কম পাওয়া যাচ্ছে। এসব রোগীদের ক্ষেত্রে সুস্থ হতে সময় বেশি লাগছে। তাদের মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকে বেশি।’
অবস্থার উত্তরণে মশা নিধন এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল হয়ে ওঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।