ছয় বছর ১০ মাসের বেশি সময় পর আগামী ১৩ ডিসেম্বর কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কক্সবাজার সফরের পাঁচ দিন পর এমন ঘোষণা এলো। সম্মেলন সফল করতে ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ।
শনিবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুরে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফরিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. মুজিবুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আগামী ১৩ ডিসেম্বর সম্মেলন উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বিশেষ অতিথি থাকবেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া এবং ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুবীর নন্দী রায়সহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭ ডিসেম্বর শহীদ শেখ কামাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিশাল জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর প্রধানমন্ত্রীর জনসভা অত্যন্ত সফল এবং স্মরণকালের সর্ববৃহৎ হয়েছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
সাড়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭ ডিসেম্বর বিকালে শহীদ শেখ কামাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিশাল জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। যেখানে প্রায় চার লাখ মানুষ উপস্থিত ছিলেন বলে জানান জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা। জনসভা ও জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা ছিল স্বাভাবিক।
জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আয়াছুর রহমান বলেন, ‘এটি কেবল আওয়ামী লীগের জনসভা ছিল না। ছিল কক্সবাজারবাসীর জনসভা। কক্সবাজারের উন্নয়নযজ্ঞের কথা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। কক্সবাজারের উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হচ্ছে মহেশখালী উপজেলায়। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী জেলার নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। হয়তো সম্মেলন নিয়েও কথা বলেছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীর মধ্যে যেমন তৎপরতা দেখা গেছে, তেমনি তৎপরতা দেখা গেছে সংসদ সদস্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদেরও। তারা নেত্রীর মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। ১৩ ডিসেম্বরের সম্মেলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কী বার্তা দিয়েছেন, তা জানতে হয়তো আরও অপেক্ষা করতে হবে।’
পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নজিবুল ইসলাম বলেন, ‘কক্সবাজার জেলা ভৌগলিকভাবে যে অবস্থায় আছে, এতে যে জনসমাগম হয়েছে তা অতীতের সব রেকর্ড ছেয়ে গেছে। এটি বর্তমান কমিটির জন্য পজিটিভ হয়ে উঠেছে। ধারণা করা হচ্ছে ১৩ ডিসেম্বর সম্মেলনে এর প্রভাব থাকবে।’
প্রধানমন্ত্রীর জনসভাকে শতভাগ সফল দাবি করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা চিরদিনের। তবে প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রমাণ দিয়েছে। সম্মেলন নিয়ম অনুযায়ী হবে। প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কী চমক দেন তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে।’
দলীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি। ছয় বছর ১০ মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সভাপতি পদে ভারপ্রাপ্তকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সম্মেলন হয়নি। এখন ১৩ ডিসেম্বর সম্মেলনে কারা নেতৃত্বে আসেন তা দেখার অপেক্ষায় নেতাকর্মীরা।
ইতোমধ্যে নানাভাবে ও প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে আওয়ামী লীগের পদপ্রত্যাশীরা নিজের অবস্থান জানান দিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী ভারমুক্ত হয়ে সভাপতি হওয়ার চেষ্টায় আছেন। সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানও সভাপতি হতে আগ্রহী। তবে তাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রেখে দিলেও নারাজ হবেন না। সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহমদ, চকরিয়া পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলমও সভাপতি প্রার্থী হতে চান। সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রণজিত দাশ প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশেক উল্লাহ রফিক, প্রচার সম্পাদক খোরশেদ আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান ও সদস্য রাশেদুল ইসলামের নামও শোনা যাচ্ছে।
তবে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, ‘১৩ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে অনেকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। এখান প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দেবেন তাই মেনে নেবো।’
জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রণজিত দাশ বলেন, ‘জেলার সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে দুই বছর ধরে কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে এই তৎপরতা ছিল বেশি। এখন প্রধানমন্ত্রী যেভাবে জেলা আওয়ামী লীগকে সাজাবেন ওটাই চূড়ান্ত হবে।’
জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান কমিটির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেসব তথ্য আছে এতে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার ঘুরে গেলেন। ১৩ ডিসেম্বর সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা দেবেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেবো।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর জনসভা সফল করায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ১৩ ডিসেম্বর সম্মেলন প্রধানমন্ত্রী যাদের দায়িত্ব দেবেন তারাই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হবেন। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে এবং সবাই মেনে নেবো।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি। সম্মেলন হওয়ার সাড়ে আট মাস পর ৭১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটির অনুমোদন দেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক। ওই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা ও সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর দলের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে ওই কমিটিতে আসে পরিবর্তন। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর জেলা কমিটির সভাপতি সিরাজুল মোস্তফাকে কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক করেন।